দুকলম পায়চারী
ডিসেম্বর 18, 2007 — susantaআখলাছ ও শহিদুল এসে বললো-
: দাদা চলেন বেড়িয়ে আসি।
: কোথায়?
: নদীর পাড়ে। একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।
বহুদিন নদীতীরে বেড়াতে যাওয়া হয়না। অথচ এখানে এলেই আমার মন ভালো হয়ে যায়। হেরাক্লিটাস বলেছিলেন-‘এক নদীতে দুবার অবগাহন সম্ভব নয়।’ আসলেই তাই। নদী কখনও পুরাতন হয় না। অনবরত প্রবহমান নদী বয়ে নিয়ে চলে নতুন জীবনের জলোচ্ছাস। কিন্তু ধরলা নদীর তীরে হাঁটতে এলে এমনটা আর মনে হয় না। নদীতীরের শহর রক্ষা বাঁধ বেদখল হয়ে গেছে। বাঁধের দুপাশের সরকারি জমিতে বছরের পর বছর ধরে বেড়ে উঠেছে অবৈধ জনবসতি। নদীভাঙনের শিকার নিরুপায় গ্রামবাসী, ভূমিদস্যু, ছিঁচকে চোর থেকে বড় অপরাধী, জনপ্রতিনিধিসহ সবাই ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিয়েছে নদীতীরের অবারিত প্রান্তরকে। দুপাশের বস্তিগুলোর মাঝখান দিয়ে একে বেঁকে চলে যাওয়া বাঁধটি দিনে দিনে সঙ্কুচিত হয়ে এসেছে। নগরবাসীর বিরক্ত দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে বস্তিগুলোতে দিনভর নিরন্ন মানুষের জীবননাটক মঞ্চায়িত হতে থাকে। আমরা গল্প করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের অনুচ্চ বাক্যগুলোকে ছিন্নভিন্ন করে এক মহিলার চিলচিৎকার চারদিক কাঁপিয়ে দিল। আখলাছ সাংবাদিক হওয়ায় তার কৌতুহল একটু বেশি। আমরাও তার পিছু পিছু হেটে গিয়ে জড়ো হওয়া লোকজনের পাশে দাঁড়ালাম।
: ঐ বেশ্যামাগীর মুখ যদি মুই ইট দিয়া থ্যাতলে না দিছং তাইলে মোর নাম ছমিরন নোয়ায়।
: ক্যা তুই উয়াক দোষ দেইস ক্যা? তোর স্বামীক ধর। তায় যদি বিয়া করা বউক ঘরোত থুয়্যা অন্য চেংরির সাথে নাং নাগায়………
আখলাছ মুহূর্তেই ঘটনাক্রম বুঝে ফেলে। সে তার নোট খাতাতে ঘটনাটি লেখতে গিয়েও লেখেনা। সে জানে এদেশের নীতিবাদী সমাজে পুরুষ মানুষের এমন চরিত্রস্খলন দোষের কিছু নয়। ঘটনা যদি বিপরীত হতো। মহিলাটিই যদি পরপুরুষের সাথে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে যেতো তাহলে তা অবশ্যই খবরের মর্যাদা পেতো। সমাজের নীতিবাদী পুরুষেরা এ ধরণের খবর পড়তে আনন্দ পায়। আধুনিক বিশ্বের দিকে পিছন ফিরে থাকা এ সমাজের রূপ এমনই। এতে অবাক হবার কিছু নেই। এখানে নারীবাদ, স্বাধীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদি মানবিক মূল্যবোধের ভুল ব্যাখ্যাকে সবাই সমর্থন করে। মানুষের প্রতি প্রবল অবিশ্বাস নিয়ে তারা প্রথমেই খুঁজে পায় নারীবাদ বা স্বাধীনতার অপব্যাখ্যাগুলোতে। এই জটিল সমীকরণে নিজেদেরকে অপাংক্তেয় মনে করে আমরা পিছিয়ে আসি। পিছন ফিরতেই আমার সাথে ধাক্কা লেগে একটি শিশু মাটিতে পড়ে গেল। আমি মমতার সাথে তাকে তুলে দাঁড় করিয়ে দিলাম। ৩/৪ বছর বয়স হবে। পেটটা কৃমি দিয়ে বোঝাই। সারা শরীরে একটুকরো কাপড় নেই। মাথার চুলের ফাঁকে ফাঁকে বালু চকচক করছে। নাক দিয়ে শ্লেষা বের হয়ে এসে থুতনি-গলা-বুক ভিজিয়ে ফেলেছে। নাগরিক সংস্কৃতি মোড়ানো আমার শরীর ঘিনঘিন করে ওঠে। গতকাল বিশ্ব শিশু দিবস গিয়েছে। কলেজ মোড়ের লাইব্রেরিতে ‘শিশু অধিকার ও প্রতিবাদী ফোরাম’ আয়োজিত ‘বিশ্ব শিশুদিবস: সমকালীন পৃথিবী ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক আলোচনা সভার প্রধান বক্তা ছিলাম আমি। অন্যান্য বক্তাদের কথা মনোযোগের সাথেই শুনেছিলাম। অন্যদের জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য শুনে নিজেকে খুবই হীন মনে হচ্ছিল। সম্ভবত সে জন্যেই আমার বক্তব্য দীর্ঘ করতে পারিনি। সভাশেষে শহিদুল-বাবু-সাজু-নারায়ণ-রফিক-বাসু এরা ঠেসে ধরেছিল। কেন বিশেষ কিছু বলিনি? ওদেরকেও তেমন কিছু বলিনি। আজ শহিদুলকে বলতে ইচ্ছে হলো। পকেট থেকে একটা চকলেট বের করে শিশুটির হাতে দিয়ে শহিদুলকে বললাম: এই শিশুটিকে দেখো। এটা কি বাস্তব নাকি কল্পনা? এই দৃশ্য যতদিন বাস্তব থাকবে ততোদিন সুধী সমাবেশে বক্তৃতা দিয়ে কিছু হবে না। কথা বলার উপর তো কোন ট্যাক্স নেই। তাই ইচ্ছে করলেই যা খুশি তা বলা যায়; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হবেনা, হয়না, হয়নি।
আমরা হাঁটতে হাঁটতে ‘গ্রোয়েন বি’তে গিয়ে বসলাম। আখলাছ এতে জোর আপত্তি জানিয়েছিলো। ওর ইচ্ছা ‘গ্রোয়েন এ’ তে বসার। সেখানে ফুলবাগান আছে, সজ্জাপ্রবণ নারীরা আছে; সেসব ছেড়ে এই বর্ণহীন ‘গ্রোয়েন বি’তে বসা যে আসলে চরম বোকামী তা বোঝাবার চেষ্টা করতে লাগলো।
শহিদুলের সাথে পাশের গ্রামের তাহের আলির দেখা হয়েছে। তাহের আলি ছেলেটা পোষাকে বেশ পশ্চিম ঘেঁষা। তার হাইকেডস, স্কিনটাইট ফেড জিন্স ও লেদার জ্যাকেট ও মাথার গোল কিস্তি টুপিটি দেশের অর্থনীতির গতিময়তার কথা প্রকাশ করছে। সেই ছেলেটি যখন দেশের সিনেমাগুলোর অশ্লীলতার কথা বললো তখন অবাক হলাম। সমসাময়িক সিনেমা নিয়ে উন্নাসিক অনেকের মতো সেও আমাকে বোঝাতে লাগলো নীতির কথা, অশ্লীলতা ও ধর্মবোধের কথা। শহিদুল বলছিলো: ‘স্বকালের সিনেমার অশ্লীলতা নিয়ে যাঁরা সোচ্চার তাদেরকে আমার প্রথম থেকেই সমাজ বিচ্ছিন্ন মনে হয়েছে। এরা নিজেকে সুস্থ ধারার সংস্কৃতিসেবী বলে মনে করে একটা আলগা আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে চায়। বর্তমানের সিনেমাতে যে স্বল্প পোষাক দেখা যায় তা যে মূলত সময়ের দাবি তা বোঝার জন্য যতোটা মননশীল হওয়ার দরকার এরা ততোটা নয়। ৭০ বা ৮০’র দশকে শাবানা-ববিতারা ব্লাউজে প্রচলিত মাপের চেয়ে বড় মাপে গলা বা পিঠ কাটতেন। ভ্যাম্প চরিত্রের নায়িকাটি তৎকালীন প্রেক্ষাপটে স্বল্প পোষাক পড়েই নাচগান করে ভিলেনের মন জয় করতো। আমাদের তথাকথিত সুস্থ্য সংস্কৃতিবাদীরা যে সিনেমাটিক সহিংসতার কথা বলতে চান তাতো কোন মিথ্যা কাহিনী নয়। সমাজে এগুলোর চেয়েও ভয়ানক ও সহিংস ঘটনা ঘটে থাকে। সামাজিক সহিংসতার হিংস্র থাবা থেকে নিরূপদ্রব গৃহকোণপ্রত্যাশী থেকে লাইব্রেরিতে গবেষণারত গবেষক কেউ নিঃশঙ্ক নয়। মাসুদ খানের বর্ণনা স্বসমাজে কতই না বাস্তব- ‘পাঠাগার থেকে চোখ মুছে ফেরে ব্যাধ’। কোন কোন ক্ষেত্রে এই সংস্কৃতিসেবীরাই ওইসব ভয়ানক ঘটনায় নিয়ামক ভূমিকা পালন করে থাকেন। ফলে নীতিহীনদের নীতিবাদীতার ঠেলায় সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের বিনোদনের সহজ পথটিও কন্টকপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যে সব সিনেমাকে তারা অশ্লীল বা সহিংস বলে আক্রমণ করে সেইসব সিনেমার দর্শক সংখ্যা বেশি। দেশের বেশিরভাগ জনগণ স্বকথিত নীতিবাদীদেরকে সমর্থন করে না। এখন যদি আমরা বাংলা সিনেমাকে অশ্লীল বলি তাহলে কি এটাই স্বীকার করা হয় না যে দেশের বেশিরভাগ জনগণ তথাকথিত অশ্লীলতাকে সমর্থন করছে। এখানে অশ্লীলতা বলতে শুধু নারীদের স্বল্পপোষাককেই চিহ্নিত করা হচ্ছে, পুরুষের স্বল্পপোষাককে মনে করা হচ্ছে না। অশ্লীলতা যদি খারাপ হয় তাহলে এর জন্য দায়ী কে? কার ব্যর্থতার পাপে দর্শক বা দেশের বেশিরভাগ জনগণের রুচি এমন নিম্নগামী হলো? আমার কাছে সব সময়ই সংস্কৃতিবাদীদেরকে দোষী মনে হয়েছে। অসংখ্য ব্যর্থতা আর ভন্ডামীর আড়ালে তাদের যে জীবনধারা তার ফল হলো এমন যে নাটকের টিকিট বিক্রি হয় না কিন্তু অশ্লীল(?) সিনেমার টিকিট পাওয়া কঠিন। এরা সংস্কৃতিবিষয়ে এমনই পন্ডিত যে তথাকথিত অশ্লীল সিনেমার অশ্লীলতাটাই তাদের চোখে পড়ে কিন্তু অভিনেতাদের অভিনয় প্রতিভার ব্যর্থতার কথা কেউ বলে না। অর্থাৎ আমি মনে করি পোষাকের স্বল্পতা আসলে কোন সমস্যা নয় আসল সমস্যা হলো পরিচালকদের শিল্পরুচিবোধ এবং অভিনেতাদের অশৈল্পিক ও অভিনয় প্রতিভাহীনতা। অশ্লীলতা বা সন্ত্রাস নয় চিন্ত্রার দরিদ্রতাই আমাদের প্রধান শত্র“।’ শহিদুলের এতোসব যুক্তির কোনটাই তাহের আলির মনপুত হচ্ছে না। আমি ‘গ্রোয়েন এ’ এর দিকে পা বাড়ালাম। আখলাছ খুশী হলো। একটি সিমেন্টের বেঞ্চে একজোড়া নারী-পুরুষ ঘনিষ্ঠভাবে বসে আছে। সামনের গোল ঘরটির ভিতরে ৬/৭ জন তরুণ চিৎকার করে করে নিজেদের মধ্যে গল্প করছে। আখলাছ গ্রোয়েনের কিনার দিয়ে নদীর কাছে নেমে গেলো। এখন নদীতে জল তেমন নেই। গ্রোয়েনের এপাশ থেকে নদীর কিনার দেখা যাচ্ছে না। আখলাছ বেশ দ্রুত নিচে নেমে গেলো।
কয়েকজন বালক এসে আমাদেরকে ঘিরে দাঁড়ালো। কেউ গান গেয়ে দু’টাকা চায়, কেউ হাতপা টিপে দেয়ার বিনিময়ে দু’টাকা চায়। আমি তাহের আলিকে জিজ্ঞাসা করলাম: ওই যে তরুণ নারীপুরুষ হাতে হাত রেখে বসে আছে আর এই ছেলেগুলো টাকা চাচ্ছে এই দুটোর মধ্যে কোনটা সমস্যা? তাহের সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো: এই ছেলেরা সমস্যা হবে কেন? এরা তো পরিশ্রমের বিনিময়ে টাকা চাচ্ছে। ছিনতাই করছে না। নিজে নিজে স্বাবলম্বী হবার পথ অল্প বয়স থেকেই খুঁজে নিচ্ছে। আর ওই নারীপুরুষ দুজনতো ইসলাম বিরোধী কাজ করছে। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে মানুষের মধ্যে এই ধরণের বেশরিয়তি মনোভঙ্গী বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কিন্তু ইচ্ছে করলো না; বরং নদীর দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগছে। একটা শুশুক তখন থেকে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। কোন মাছকে তাড়া করেছে হয়তো। শৈশবে এই ধরলা নদীতে আমি সারাবছরই শুশুক দেখতাম। সে সময় নদীর গতিপথ ভিন্ন ছিলো। এই অঞ্চলের সুখ্যাত সানাই বাদক ‘সুলকু’ এর নামানুসারে গড়ে ওঠা বর্তমানের ‘সুলকুর বাজার’ এর পা ধুয়ে ধরলা বয়ে যেতো। তখন নদীর নাব্য বেশি ছিলো। বিভিন্ন রকম পরিযায়ী পাখির হাট বসে যেতো চরাচরে। নদীর দুই তীরের খাড়া ঢালে অসংখ্য খরগোশ বাস করতো। একবার একটি খরগোশকে তাড়া করতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়েছিলাম ঝোপের উপরে। সঙ্গে সঙ্গে অনেকগুলো খরগোশ ঝোপ থেকে বের হয়ে চারিদিকে ছুটে পালালো। আমি চোখভরা বিস্ময় নিয়ে বিমূঢ় দাঁড়িয়েছিলাম।
আখলাছ আসলে এতক্ষণ নদীর জলে দুপা ডুবিয়ে পাথরের উপর বসে একজন তরুণীর সাথে কথা বলছিলো। সন্ধ্যার আভাসে চারদিক গাঢ় হয়ে আসতেই ওরা উঠে পড়লো। আমার সামনে এসে আখলাছ পরিচয় করিয়ে দিলো।
: দাদা, এর নাম শায়লা। আমরা আগামী মাসে বিয়ে করছি।
আমি আখলাছের অকপট বক্তব্যে মুগ্ধ হলাম। শ্যামলা রঙের শায়লা কপালে টিপ পড়েছে। বড় সুন্দর করে হাসতে জানে।
ফিরে আসতে আসতে শায়লার একটি কথা বারবার মনে পড়ছিলো। ও বলছিলো ধরলা ব্রিজের কথা।
: চারপাশের হাজারো নিরাশার মাঝে আমাদের সমস্ত আশাগুলো গড়ে তুলবে ভবিষ্যতের স্বপ্নসেতু।








