অতীশ দীপঙ্কর

প্রচলিত ইতিহাসে রাজা, জমিদার, সামন্তপ্রভু প্রমুখের তলোয়ারবাজির বিস্তারিত বর্ণনা লেখা হয়। কোন যোদ্ধার তলোয়ার কত বড়, কোন বাদশা রাজ্য দখলের অজুহাতে মানুষ খুনে পারদর্শী ছিলেন, কোন বীরযোদ্ধা প্রেমহীন নারীভোগে বিখ্যাত ছিলেন ইত্যাদির বিশদ বর্ণনায় ইতিহাসবিদরা মোটেও কার্পণ্য করেননি। কিন্তু সাধারণ মানুষদের জীবনবর্ণনায় তাঁরা উপেক্ষার পক্ষপাত প্রদর্শনে ছিলেন দ্ব্যর্থহীন। ফলে কৃষক, শ্রমিক, মজুর তথা সমাজের খেটেখাওয়া মানুষদের প্রাত্যাহিক জীবন থেকে গেছে ইতিহাসের অন্ধকারে। সেকালের সাধারণ মানুষদের প্রাত্যাহিক খাদ্যাভ্যাস, পাঠআগ্রহ, জীবনবিকাশের সংগ্রাম প্রভৃতি সম্পর্কে ইতিহাস একেবারেই নির্বাক। ইতিহাসে উপেক্ষিত থাকলেও কেউ কেউ তাঁদের প্রজ্ঞা ও কর্মতৎপরতার সৌকর্যে জনমানসে স্থায়ী আসন লাভ করেছেন। মানুষ পরম শ্রদ্ধায় তাঁদেরকে চিরকালীন সম্মানের উচ্চ শিখরে তুলে রেখেছেন। এরকমই একজন ইতিহাসে স্থান না পাওয়া প্রখ্যাত মানুষ হলেন অতীশ দীপঙ্কর।

বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী বাঙালীদের মধ্যে সর্বপ্রথম এবং সবচাইতে বেশিদিন ধরে আন্তর্জাতিক মণ্ডলে সম্মানিত হয়ে আসছেন একমাত্র অতীশ দীপঙ্কর। তিনি কোন রাজা-বাদশা নন, কোন যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি নরহত্যায় দক্ষতা দেখাননি, সাধারণ জনগোষ্ঠীর সম্পদ লুণ্ঠনেও তিনি পারদর্শী নন তাই হয়তো ইতিহাসের পাঠকরা তাঁকে চেনেননা। তাই বলে তিনি জনমানসে বিস্মৃত নন। বরং যারা বিদ্যা ও জ্ঞানকে প্রয়োজনীয় ও কাক্সিক্ষত বিবেচনা করেন তাদের কাছে অতীশ দীপঙ্কর এখনও রয়ে গেছেন চিরনমস্য। মেধার কল্যাণী স্ফুরণ তাঁকে যেকালে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দিয়েছিল তা অনেকের দৃষ্টিতে অন্ধকার কাল বলে নিন্দিত। কালের বিবেচনায় সেকালে বাংলা বলে কোন স্বতন্ত্র ভাষা কিংবা বাঙালি বলে কোন স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠীর জন্মই হয়নি। বাংলা ভাষার প্রদীপ তখন প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল মাত্র। সেই ৯৮২ খ্রিস্টাব্দে পৃথিবীর অপার নীল আকাশে প্রথম দৃষ্টিপাত করেন তিনি। আধুনিক বাংলাদেশের বিক্রমপুর জেলার অন্তর্গত বজ্রযোগিনী গ্রামের নিবিড় প্রাকৃতিক পরিবেশে তিনি অতিক্রম করেন তাঁর শৈশব ও কৈশোরকাল।

সেকালের সমাজ ছিল সামন্ত প্রভাবিত। ফলে সাধারণ মানুষ নিয়মিত যুদ্ধবিগ্রহের আতংকের মধ্যেই জীবনযাপন করতো। প্রত্যক্ষ করতো রক্তলোভী শাসকের পাশবিক উল্লাস। এমন মধ্যযুগীয় সমাজব্যবস্থার মধ্যে জন্মগ্রহণ করেও অতীশ দীপঙ্কর বিদ্যা, জ্ঞান, সততা, সরলতা, পাণ্ডিত্যে সর্বভারতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিবেচিত হয়েছিলেন। আধুনিক কালের বাঙালীর শত ব্যর্থতা ও মিথ্যাচারের বিপরীতে সহস্র বৎসর অতীতের একজন বাঙালীর জ্ঞান-বিদ্যার জগতে শীর্ষস্থান লাভের বিষয়টি সত্যিই আলোচনার দাবী রাখে।

খ্রিস্টপূর্ব ৬২৩ অব্দে মহামুণি গৌতম বুদ্ধ জন্মগ্রহণ করেন। নেপালের লুম্বিনী গ্রামে বোধি বৃক্ষের ছায়ায়, মহামায়া মাতার কোলে। তিনি ৩১ বৎসর বয়সে সংসারে বৈরাগ্য বোধ করেন। তিনি একটি নতুন দর্শন, সমাজ মর্মবোধের সাথে মানব জাতির পরিচয় ঘটান।

আজ থেকে আড়াই হাজার বৎসর আগে যখন তিনি জন্মেছিলেন সমাজ ব্যবস্থার নৃতাত্ত্বিক ধারায় ভারতীয় সমাজ তখন কৃষিজীবী জীবন যাপন করছে। বিভিন্ন ধাতুর ব্যবহার শিখেছে। গৃহপালিত প্রাণীদেরকে নির্দিষ্ট করতে পেরেছে। আধুনিক যুগের তুলনায় আদিম জীবনযাত্রায় বাস করে গৌতম বুদ্ধ যে জীবন দর্শনকে উপলব্ধি করেছিলেন, তার আবেদন আজও শেষ হয়ে যায়নি। তাঁর মৃত্যুর কিছু পরে পণ্ডিত সক্রেটিসের সুযোগ্য ছাত্র গ্রীক বীর আলেকজান্ডার ভারত জয় করে। ফলে ভারতীয় জ্ঞান বিজ্ঞান আন্তর্জাতিক পরিচিতি পাওয়া শুরু করে। মেগাস্থিনিসের অনেক রচনায় বৌদ্ধদর্শনের কথা লেখা আছে। গৌতম বুদ্ধের পরে যে দার্শনিকেরা জন্ম নিয়েছেন তাদের মধ্যে জৈন ধর্মগুরু মহাবীর(৫৯৯ খ্রিস্টপূর্ব), পিথাগোরাস (৫৭০- ৫০০ খ্রি.পূ.), হেরাক্লিটাস (৫৩৫- ৪৭৫ খ্রি.পূ.), সক্রেটিস (৪৬৯- ৩৯৯ খ্রি.পূ.), এরিস্টটল (৩৮৪- ৩২২ খ্রি.পূ.) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। এদের মাধ্যমে বৌদ্ধ দর্শন ইউরোপে বাহিত হয়। আধুনিক যুগের কান্ট, হেগেল, মার্কস, জাঁ পল সার্ত, আলবেয়ার কাম্যু, কার্ল মার্ক্স প্রমুখের লেখায় বৌদ্ধদর্শনের স্পর্শ বেশ স্পষ্ট।

গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর পর তাঁর দর্শন সম্বন্ধে জানতে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা বেড়ে যায়। হিমালয়ের অপরপার্শ্বে অবস্থিত চীনের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী নিজেদের অন্তর্কলহ মেটাতে মহান লাওৎসে প্রবর্তিত তাওবাদ ও জ্ঞানী কনফুসিয়াসের কনফুসিয়াসবাদের বিপরীতে বৌদ্ধদর্শনের গুরুত্ব অনুধাবন করেন। খৃস্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকেই ভারত ও চীনের পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। চীন অঞ্চল থেকে যেসব শ্রমণরা ভারত ভ্রমণে আসেন তাঁদের মধ্যে ‘ফা-হিয়েন’ (মতান্তরে ‘ফা-হিয়ান’) আসেন ৩৯৯ খ্রিস্টাব্দে, ‘চে-মেং (মতান্তরে ‘চি-য়েন) আসেন ৪০৪ খ্রিস্টাব্দে, ‘ফা-ইয়ং আসেন ৪২০ খ্রিস্টাব্দে, ‘হিউয়েন সাঙ’ ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে, ‘ই-চিং’ (মতান্তরে ‘আই-ৎ-সিঙ্গ’ বা ‘ইৎ-সিঙ’) ৬৭২ খ্রিস্টাব্দে এবং ‘উ-খোং’ আসেন ৭৫১ খ্রিস্টাব্দে। এক বৎসরের দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে চীন থেকে এই পণ্ডিতেরা ভারতে এসে এদেশীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে যে আগ্রহ প্রকাশ করেছে তাঁর বিপরীত উদাহরণ ইতিহাসে বিরল। বিদেশ থেকে ভারতে ধর্মানুরাগী শ্রমণরাই শুধু এসেছেন এমন নয়। ভারত থেকেও বেশকিছু বৌদ্ধশাস্ত্রীয় পণ্ডিত মধ্য এশিয়ার প্রান্ত পর্যন্ত বুদ্ধের বাণী বহন করে নিয়ে গিয়েছেন। ‘শান্তরক্ষিত’, ‘পদ্মসম্ভব’, ‘কমলশীল’ প্রমুখ ভারতীয় পণ্ডিতদের নাম তিব্বতীয় গ্রন্থগুলিতে পাওয়া যায়। ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে গিয়ে যারা বৌদ্ধদর্শনের মহত্বকে বিদেশীদের চোখে কাক্সিক্ষত করে তুলেছিলেন তাঁদের মধ্যে একমাত্র অতীশ দীপংকরই প্রখ্যাত হয়েছিলেন। ৯৮২ খ্রিস্টাব্দে বর্তমানের বাংলাদেশ অঞ্চলে জন্ম নেয়া অতীশ দীপংকর প্রথম জীবনে তান্ত্রিক হতে চেয়েছিলেন। এসময়ে তিনি ধারণ করেন ‘গুহ্যজ্ঞানবজ্র’ নাম। আচার্য অবধূতিপা ছাড়াও বিখ্যাত পন্ডিত সিদ্ধাচার্য নারোপা এবং ডোম্বিপা তাঁর গুরু ছিলেন। উনতিরিশ বৎসর বয়সে তিনি বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হয়ে ‘দীপংকর শ্রীজ্ঞান’ নাম গ্রহণ করেন। তিব্বত ও মঙ্গোলিয়ায় অতীশ দীপংকর এত বেশি সুখ্যাত যে এখনও তিনি ‘জোবো জে’ (মহাগুরু  অতীশ) নামে পূজিত হন। ১০১৩ খ্রিস্টাব্দে একতিরিশ বৎসর বয়সে তিনি অদ্বিতীয় পণ্ডিত ধর্মকীর্তির কাছে জ্ঞানশিক্ষা করার ইচ্ছা নিয়ে সুবর্ণদ্বীপে (ইন্দোনেশিয়া) আসেন। বারো বৎসর ধরে সুমাত্রায় থেকে বৌদ্ধধর্মচর্চা করেন। ১০২৫ খ্রিস্টাব্দে সুমাত্রার রাজনৈতিক পরিবেশ দূষিত হয়ে যাবার কারণে তিনি ভারতে ফিরে আসেন। বাংলা অঞ্চলের বিখ্যাত ‘বিক্রমশীল বিহার’, ওদন্তপুরী বিহার’ ও ‘সোমপুর বিহার’ তাঁকে অধ্যাপক হিসেবে গ্রহণ করে। সোমপুর মহাবিহারে কয়েক বৎসর শিক্ষকতাকালে তিনি ‘মধ্যমকরত্নপ্রদীপ’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। তিব্বতে নতুন ধর্ম হিসেবে বৌদ্ধ ধর্ম এই সময়ের আগে থেকেই  যাত্রা শুরু করেছে। কিন্তু যথাযথ ব্যাখ্যাকারের অভাবে বৌদ্ধধর্মের মূল আস্বাদ ও উপলব্ধি অনেকাংশে ম্লান হয়ে যাচ্ছিল। সমাজে বেড়ে ওঠা অস্থিরতার পরিমাণও সীমিত রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। এই সময়ে তিব্বতবাসীরা অতীশ দীপংকরের মতো পণ্ডিতের প্রয়োজন বোধ করেন। তিব্বতবাসী ভিক্ষুদের জোর পীড়াপীড়িতে অতীশ দীপংকর তিন বৎসরের জন্য তিব্বতের বৌদ্ধশাস্ত্রীয় আবহাওয়াকে পূর্ববৎ নির্মল করার জন্য কাজ করবেন বলে কথা দিলেন। ১০৪০ খ্রিস্টাব্দে কয়েকজন শিষ্য, দোভাষী এবং বেশকিছু গ্রন্থ নিয়ে তিব্বতের দিকে রওনা হন। বৌদ্ধ ধর্মকে তিনি এতবেশি ভালোবাসতেন যে আটান্ন বৎসর বয়সে পনেরো-ষোল হাজার উঁচু বরফে ঢাকা পাহাড়ী পথ বেয়ে তিব্বতে যাওয়াকে তিনি কঠিন ভাবেননি। তবে শর্ত মোতাবেক তিন বৎসরের মধ্যে ভারতে ফিরে আসবেন সে দুরাশাও মনের মধ্যে বহন করতেন না। প্রায় দেড়শো বৎসর আগে তিব্বতের ‘লাংদারমা’ নামে এক রাজা বৌদ্ধধর্মের উপর প্রভূত অত্যাচার করেছিল। অসংখ্য বৌদ্ধমঠ ধ্বংস এবং অসংখ্য বৌদ্ধ ভিক্ষুকে হত্যার পর একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুর হাতে তিনি নিহত হন। এই সম্পর্কিত রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনাপ্রবাহ অতীশ দীপংকরের কাল পর্যন্তও ধারাবাহিক ছিল। ফলে অতীশকে তিব্বতে অনেক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাবলীর মুখোমুখি হয়েই সামনের পথে এগিয়ে যেতে হয়েছিল। তিব্বতে অতীশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল ‘বোধি-পথ-প্রদীপ’ গ্রন্থটি লেখা। এর টীকা গ্রন্থটির নাম ‘বোধিমার্গ-প্রদীপ-পঞ্জিকা’। এছাড়াও তিনি ‘রত্নকরণ্ডোদঘাট’, ‘অভিসময়-বিভঙ্গ’, ‘চিতা-বিধি’, নাগ-বলি-বিধি, ‘চিকিৎসা-জীব-সার, ‘দশ-অকুশল-কর্ম-পথ-দেশনা’ প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেন। তেরো বৎসরের তিব্বত বাসকালে তিনি প্রায় সমস্ত তিব্বতী বৌদ্ধমঠে ভ্রমণের সঙ্গে সঙ্গে অন্তত ৭৯টি গ্রন্থ সংস্কৃত ভাষায় রচনা করেন। এজন্য তিনি তিব্বতীদের দ্বারা সম্মানজনক ‘অতীশ’ উপাধিতে ভূষিত হন। তিব্বতী ভাষায় তেমন অধিকার না থাকার কারণে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান সবসময় সংস্কৃত ভাষায় লিখতেন এবং সাথে থাকা অনুসারীরা তা তিব্বতী ভাষায় অনুবাদ করে ফেলত। ১০৫৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি তিব্বতেই মৃত্যু বরণ করেন। প্রাচীন যুগের এই মহান বাঙালি পণ্ডিত তিব্বতের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে এভাবেই চিরস্থায়ী আসন তৈরি করে নেন।

১২০০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে ভারতে প্রাপ্ত গৌতম বুদ্ধ সম্পর্কিত বেশিরভাগ গ্রন্থ যার আনুমানিক সর্বমোট সংখ্যা ১৪ হাজার, এর সবগুলো তিব্বতী ও বিভিন্ন বিদেশী ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিল। তিব্বতে এই বিশাল গ্রন্থরাশি দুইভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রথমটির নাম ‘তাঞ্জুর’ এবং দ্বিতীয়টির নাম ‘কাঞ্জুর’। তাঞ্জুরে আছে সাড়ে তিন হাজার বৌদ্ধ ধর্মীয় গ্রন্থের অনুবাদ আর কাঞ্জুরে রয়েছে বুদ্ধের বাণী সম্বলিত এগারোশো আটটি গ্রন্থ। অতীশ দীপঙ্করের লেখা গ্রন্থগুলির সবগুলো এখনও তিব্বতী ভাষায় অনূদিত হয়ে ‘তাঞ্জুর’ সংকলনে রয়েছে। ভারতবর্ষে পরবর্তী বিদেশী শাসনের কালে সংস্কৃতে লেখা এই অমূল্য গ্রন্থরাজি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। আধুনিক যুগে তিব্বতী অনুবাদ থেকে ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমেই ইতিহাসকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হয়েছে।

Leave a Reply