ভয়াবহ বার্ড ফ্লু

ভয়াবহ বার্ড ফ্লু নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা আছে কি নেই তা ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা। কারণ ইন্টারনেটে বেশ কিছু বাংলা ব্লগ ও সাইট আছে যারা বার্ড ফ্লু নিয়ে মোটেও আলোচনা করছেনা। তারা প্রযুক্তিপ্রেমিক হতে চায় কিন্তু যথার্থ বিজ্ঞানসচেতনতা বলতে যা বোঝায় তা হয়তো বোঝে কিনা তা নিযে আমার সন্দেহ আছে। যা হোক আমার স্বল্পজ্ঞানে বার্ড ফ্লু সম্পর্কে যা বুঝেছি ও জেনেছি তা নিম্নরূপ:

মনে করা হয় সাভারের ক্যান্টনমেন্ট পোলট্রি ফার্ম থেকে সারা বাংলাদেশে বার্ড ফ্লু ছড়িয়ে পড়েছে। ফার্মটির পাশে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে প্রত্যেক শীতকালে অসংখ্য পরিযায়ী পাখি আসে। তারা বছরের প্রায় ছয়মাস এখানে থাকে। এদের কারও মাধ্যমে সম্ভবত বার্ড ফ্লু বা এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বাংলাদেশে ছড়িয়েছে। সময়মতো যথাযথ সতর্কতা প্রদর্শন করা হয়নি বলে এই ফার্ম থেকে সারা বাংলাদেশে রোগের সংক্রমণ ঘটেছে। কারণ এই ফার্মটি বেশ বড়। এখান থেকে বাচ্চা, ডিম অন্যান্য ফার্মে সরবরাহ করা হয়।

পরিচিতি: এটা একধরণের ভাইরাসজনিত রোগ। H5N1 নামের এই ভাইরাসটি খুব ভয়ানক। বারবার রূপ পাল্টানোর কারণে একে চেনা কঠিন। সাধারণত: পরিযায়ী পাখি, মুরগি, কবুতর এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। হাঁস আক্রান্ত হয় কিন্তু মারা যায়না।

লক্ষণ: পরিযায়ী পাখি, মুরগি ও মানুষের ক্ষেত্রে আক্রান্ত হওয়ার পরের লক্ষণগুলি প্রায় একই রকমের। সর্দির মতো সব লক্ষণ। হাচিঁ, কাশি, নাক দিয়ে শ্লেষা পড়া, মাথাব্যাথা (শুধু মানুষ প্রকাশকরতে পারে), শরীর অবসন্ন লাগা, জ্বর। মুরগি বা পাখির পালক ফুলে উঠবে বা খাড়াখাড়া হবে, এলোমেলো হবে। আপাতদৃষ্টিতে সর্দি বলে মনে হতে পারে, তাই তাৎক্ষণিকভাবে বার্ড ফ্লুকে চিহ্নিত করা কঠিন। মানুষের ক্ষেত্রে মনে হবে হয়তো সাধারন সর্দিজ্বর হয়েছে বা খুব বেশি হলে ইনফ্লুয়েঞ্জা হয়েছে। আর মুরগির ক্ষেত্রে মনে হবে হয়তো রাণীক্ষেত রোগ হয়েছে। কারন রাণীক্ষেত রোগেও মুরগির সর্দি হয়, বসে বসে ঝিমায়, নাক দিয়ে শ্লেষা পড়ে। ভুল বোঝার কারণে বার্ড ফ্লু রোগকে শনাক্ত করা যায়না। ফলে এটা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

চিকিৎসা: ভয়াবহ ঘটনা হচ্ছে এই রোগের কোন চিকিৎসা নেই। মানুষ বা মুরগির দেহের প্রাথমিক লক্ষণগুলি দেখে বোঝায় উপায় নেই যে তার বার্ডফ্লু হয়েছে কিনা। ফলে প্রচলিত চিকিৎসাতেও রোগীর কোন উপকার হয়না। যখন দ্রুত মারা যায় তখন আর কোন কিছু করার কোন উপায় থাকেনা। এই রোগে আক্রান্ত হলে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। কারণ এর কোন চিকিৎসা নেই। কোন কার্যকরী টিকা এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হয় নাই।

বাহক: বাতাসে খুব সহজে এই রোগের জীবাণূ স্থান পরিবর্তন করে। জলবাহিত হয়েও এটা লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ে। হাঁস এই রোগে আক্রান্ত হয় কিন্তু মারা যায়না বা অসুস্থ হয়না। মারা না গেলেও হাঁস এই রোগের ভাইরাস বহন করে। ফলে মুরগির সংস্পর্শে না এসে শুধু হাঁসের সংস্পর্শে এলেও বার্ডফ্লু রোগ হতে পারে।

সতর্কতা: যেহেতু এই রোগের কোন ঔষধ নেই, সেহেতু সচেতনতাই কাউকে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে। প্রতিষেধকের অভাবে প্রতিরোধ ছাড়া আর কোন গত্যন্তর নেই। বড়দের তুলনায় শিশুদেরকে বেশি সতর্ক থাকতে হবে। কারণ তাদের শরীর প্রতিনিয়ত বড় হচ্ছে বলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে।

* রোগাক্রান্ত মুরগির শরীরে হাত দেয়া যাবেনা।
* কোন মুরগি বা পাখি মারা গেলে তা স্পর্শ করা যাবেনা। স্থানীয় কমিশনার বা নিকটবর্তী প্রশাসন বা স্থানীয় প্শুসম্পদ অফিসে জানাতে হবে। তারা সাথে সাথে প্রতিরোধক পোষাক পরে ও যন্ত্রপাতি নিয়ে মরা প্রাণীটি অপসারণ করবে।
* মরা মুরগির পায়খানাতেও জীবাণ থাকে। ফলে এই বিষ্ঠাগুলো মাছের খাবার কিংবা জমিতে সার হিসেবে ব্যবহার করা যাবেনা।
* মরা পাখি/ মুরগি ৮ ফুট গভীর গর্তে পুঁতে ফেলতে হবে। তার উপরে চুন দিয়ে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। মৃত মুরগীর লাশের উপরে কমপক্ষে ৩ ফুটের বেশি পুরুত্বের মাটি চাপা দিতে হবে। যেন শিয়াল/ কুকুর জাতীয় কোন প্রাণী কবর খুঁড়তে না পারে।
* কবরস্থান, মারা যাওয়ার স্থান প্রভৃতি জায়গায় জীবাণুনাশক রাসায়নিক দ্রব্য ছিটিয়ে দিতে হবে।
* গৃহপালিত হাঁস-মুরগিকে বন্য পাখিদের সাথে মেলামেশা করতে দেয়া যাবেনা।
* রোগাক্রান্ত মুরগির কাছাকাছি যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
* ফার্মে কর্মরতদের অবশ্যই হাত এবং শরীরের খোলা অংশ ভালোভাবে সাবান দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে।
* কোন জায়গায় বার্ড ফ্লু ধরা পড়লে তার চারপাশের ১ কি.মি. এলাকার সব হাঁস মুরগি কবুতর মেরে ফেলতে হবে। প্রাপ্ত ডিম সব ধ্বংস করে ফেলতে হবে।
* রোগাক্রান্ত এলাকায় ৩ মাসের জন্য সব ধরণের পাখি পালন নিষিদ্ধ করা হয়। তিন মাস পর পরীক্ষার জন্য কয়েকটি মুরগি এই এলাকায় ছেড়ে দিয়ে কয়েকদিন ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। যদি এই নতুন মুরগিগুলো আক্রান্ত হয় তাহলে বুঝতে হবে সেখানে এখনও বার্ড ফ্লু এর জীবাণু আছে। আবার তিন মাসের জন্য জায়গাটাতে পাখি পালন নিষিদ্ধ করা হয়। এভাবে পর্যায়ক্রমে পরীক্ষাটা চলতে থাকবে।

Leave a Reply