১লা বৈশাখের ভাবনা
এপ্রিল 16, 2008 — susanta১লা বৈশাখ যথারীতি এল এবং গেল।
আমি সাধারণত বিশেষ কোন আবেগ অনুভব করি না। এর একাধিক কারণ আছে। ইদানীং ১লা বৈশাখ নিয়ে যে মাতামাতি শুরু হয়েছে তাকে আমার সাময়িক বলেই মনে হয়। ১৫-২০ বছর আগে নববর্ষ আমরা নিজেদের বাড়িতে ঘরোয়া পরিবেশে পালন করতাম। এখনও করি।
যথারীতি চৈত্র সংক্রান্তির দিন নিরামিষ আর ১লা বৈশাখে মাছ বা মাংস রান্না হত/ হয়। ইলিশ পান্তার ভন্ডামী কখনো বাসায় ছিল না। মনে পড়ে ৮৮-৮৯ এর দিকে যখন এইচএসসি পড়ি তখন একজন ক্লাশফ্রেন্ডকে নববর্ষের কার্ড দিয়েছিলাম। সে পরে অন্যদের কাছে আমাকে সাম্প্রদায়িক বলে মন্তব্য করেছিল। ইদানীং ঢাকায় ১লা বৈশাখ নিয়ে যে উল্লাস হয় তার আয়ুষ্কাল কতদিন? আমার ধারণা খুব বেশি হলে ৩৫-৪০ বৎসর। বাঙালি জাতি হিসেবে পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য হবে। কারণ এই মুহূর্তে বাঙালি বা বাংলাদেশীদের মধ্যে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মেধাবী মানুষের বড় অভাব। প্রধানত সাহিত্য একটা জাতির আদর্শ, নীতি, লক্ষ্য তৈরি করে দেয়। বিজ্ঞানীরা নানাকিছু আবিষ্কার করে জীবনযাপনকে সহজ করতে পারেন কিন্তু জাতীয়তাবোধ তৈরিতে তাদের ততটা অবদান নেই। তো সেই সাহিত্যাঙ্গনে বাংলার অবস্থান কোথায়? স্বাধীনতার পর থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি দেবার মত সাহিত্যিক আমাদের নেই। অনেকে ভারতের তুলনা দেন। কিন্তু আমি তা করতে চাইনা। সেখানে হিন্দী ভাষাভাষীদের তুলনায় বাঙালিদের মেধা বা কীর্তি ততোটা উল্লেখযোগ্য নয়। বুকার পুরস্কার বা এরকম আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাঙালি লেখকদের পদচারণা এখন দুর্লভ হয়ে পড়েছে। (তবে ভারতের বিষয় নিয়ে আমি ভাবিত নই) বাংলাদেশের কয়েকজন চিত্রশিল্পী এবং স্থাপত্যশিল্পী আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্মানিত হন। কিন্তু সাহিত্যিক কত জন আছেন? নেই বললেই চলে। তাহলে সংস্কৃতির চালক কে হবেন? সাহিত্যিক নাকি মঞ্চশিল্পী, বিজ্ঞানী, কম্পিউটার/ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার কে? মঞ্চশিল্পীরা কি নতুন কোন নৃত্যভঙ্গি বা সঙ্গীতশিল্পীরা কি নতুন কোন সঙ্গীতধারা বা কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়াররা কি নতুন কোন অপারেটিং সিস্টেম (বা কম্পিউটার সম্পর্কিত কোন মৌলিক কিছু) বা সিভিল ইঞ্জিনিয়াররা কি নতুন কোন আবাসন (বা তাদের বিষয়গত মৌলিক কিছু) বা বিজ্ঞানীরা কি নতুন কোন আবিষ্কার করতে পেরেছেন? আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমাদৃত হয় এমন কিছুর জন্ম দিতে পেরেছেন? না পারেননি। তারা ইংরেজিভাষীদের (আমি পশ্চিমা শব্দটি ব্যবহারে আগ্রহী নই) আবিষ্কার- উদ্ভাবনকে হয়তো মডারেট করছেন। তাদের উদ্ভাবনের উপর নিজস্ব রঙ বা কোন ডিজাইন প্রতিস্থাপন করছেন। এটাকে কোন মৌলিক কাজ বলা যায় না।
সম্প্রতি চাল নিয়ে ভারতের সাথে যে সমস্যা এতে অনেকে ভারতকে দোষ দিচ্ছেন। কিন্তু আমি অন্যের দোষ খোঁজার আগে নিজের দোষটা খুঁজতে চাই। আমরা কি চাল উৎপাদনে সয়ংসম্পূর্ণ হতে পারতাম না? তাহলে আমরাই বরং ভারতের বিপদের দিনে চাল দিতাম না। ঘটনার নেতৃত্ব আমাদের হাতেই থাকত। জনসংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে যদি এই সমস্যা হয়ে থাকে তাহলেও তো দোষটা আমাদের। মাছির মত বংশ বিস্তার করার দরকার কি ছিল? যে জাতি ভবিষ্যতের কথা ভাবতে পারে না তার তো ভবিষ্যত বলতে কিছু থাকে না।
বৈশাখী উৎসবে যে ধরণের আচরণ করা হয় তা কতটুকু বাঙালিসুলভ বা হিন্দুসুলভ? অনেকে ইসলামিস্টদের বক্তব্যে দোষ খোঁজেন, কিন্তু আমি নীতির প্রশ্নে ইসলামিস্টদের দোষ দেখি না। ইসলাম হচ্ছে একটি টোটাল জীবনব্যবস্থা (ওই মত অনুযায়ী)। এখানে চিন্তার স্বাধীনতা বা ব্যক্তি স্বাধীনতা বলতে কিছুই নেই। মনে রাখতে হবে মুতাজিলাদের মতবাদ আমরা কেউই মেনে চলি না। বা তাদেরকে আমরা ভাল মানুষ বলেও স্মরণ করি না। মূর্তি নিয়ে প্রদক্ষিণ বা রঙ খেলা বা নাচানাচি এই বিষয়গুলো তো আদর্শগতভাবে সম্পূর্ণ বিপরীত। তাহলে যারা এসব করছে তারা কি ভুল করছে? হয়তো ভুল করছেনা। এর কারণ আসলে এটাই যে তারা জানেনা যে তারা ভুল করছে। কোন একটি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করতে হলে তাকে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে হবে, প্রাত্যাহিক জীবনে তার প্রভাব থাকতে হবে। না হলে তা অন্ত:সারশূন্য আস্ফালনে পরিণত হয়। এই বিষয়গুলো এমনই যে যদি তা অন্তরের অন্তস্থলে প্রোথিত আদর্শ বা নীতিবোধের সাথে না মেলে তাহলে তা এমনিতেই টিকে থাকে না। তাই আমার মনে হয় যারা ১লা বৈশাখকে নিয়ে বিভিন্ন ভঙ্গি করছে তাদের নিজেদেরকেই নিজের মনে প্রশ্ন তুলতে হবে। এজন্য সংস্কৃতির স্বরূপকে চিনতে হবে। আজকে যে মাতামাতি তা অনেকাংশে ঢাকা এবং জেলা শহরকেন্দ্রিক। গ্রামে কি এর কোন প্রভাব আছে। মাত্র ২০% লোকের মনোভঙ্গি দিয়ে একটা দেশকে বোঝা যায় না। বাংলাদেশের আপামর জনগণ আবহমান কাল ধরে যে জীবন যাপন করছে তাই বাঙালিত্ব। এতে নাগরিক রূপ দেয়া হল রঙের প্রলেপ মাত্র (বাংলাদেশে আদতে সংজ্ঞানুযায়ী কোন নগর নেই। তার মানে নাগরিক বলতে আসলে কেউ নাই। ঢাকা মূলত একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম মাত্র)। তারা এমন দরিদ্র যে ইলিশ মাছ কেনার কথা তারা স্বপ্নেও ভাবে না। ১লা বৈশাখ তাদের বাড়িঘর পরিচ্ছন্ন রাখবার দিন। (নতুন জামাকাপড়? তাহলে ঈদে কি করবে?) সারাদিন কোন খারাপ কথা না বলার দিন। ঝগড়াঝাটি এড়িয়ে চলার দিন। নতুন সাংস্কৃতিক জাগরণে (??) কোনদিন তাদের কোন যায় আসে নি, আজকেও আসে না। নতুন কোন সংস্কৃতিকে জাগরিত করার মত শক্তি কি আমাদের আছে?








