অবিরাম বৃষ্টি

চলছে বর্ষাকাল। সারাদিন ধরে, সারাদিন ব্যাপী। আকাশে মেঘের যে ঘনঘটা দেখা যাচ্ছে এবং বৃষ্টির যে উন্মাদনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে তাতে নিশ্চিত বলা যায় এবার বন্যা হবে। কুড়িগ্রাম জেলা বড় বড় তিনটি নদী দিয়ে পরিবেষ্টিত। পূর্বে ব্রহ্মপুত্র, মাঝে ধরলা, পশ্চিমে তিস্তা। উত্তরে দুধকুমার নদীও আছে। এদের মধ্যে দুধকুমার নদীটিই যা একটু ছোট। তবে কোনটাই আয়তন বা আকারগত দিক থেকে ছোট নয়। নাটোর, নওগাঁতে যেমন দেখেছি, আত্রাই বা অন্যান্য কিছু নদীগুলোকে আমার চোখে খাল বা ক্যানেল বলেই মনে হয়। অবশ্য সেগুলোতে চর পরে না কিংবা পাড় ভাঙ্গে না বলে এমন মনে হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে কুড়িগ্রামের নদীগুলো প্রত্যেকটাই কমবেশি বিরাট। আর ব্রহ্মপুত্রকে তো বিশালাকার বলতেই হবে। বর্ষাকালে কুড়িগ্রামে দু’এক বৎসর পরপর বন্যা হয়েই থাকে। এটা আমি ছোটকাল থেকে দেখে আসছি। যে ধরলা নদী বসন্তকালে (ফাল্গুন-চৈত্র মাসে) আধা কি.মি. মত আয়তনে নেমে আসে, সেই ধরলা নদীই বন্যার সময় ২-৩ কি.মি. প্রশস্থ হয়ে যায়। শুকনার সময় সাঁতরে পার হওয়া যায়। (অনায়াসে না হোক, আমি নিজে পার হয়েছিলাম। সাথে বেশ কয়েকজন ছিল) সেই ধরলাকে বর্ষাকালে দেখলে ভয় লাগে। জলের সে কী তীব্র স্রোত! স্যালো ইঞ্জিনের নৌকাও সোজা এপাড় ওপাড় যেতে পারে না। এবারও হয়তো সেরকম কোন বন্যা হবে। সন্ধ্যায় টিভির সামনে বসেছিলাম। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তুমুল বৃষ্টিপাত হয়েছে। মেদিনীপুরে নাকি দারুণ বন্যা হয়েছে। ভ্রাম্যমান সাংবাদিক বলছিলেন যে তাঁরা নাকি জনপদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। সরকার যদি হেলিকপ্টার পাঠায় তাহলে ভাল হয়। এই যদি হয় ভারতের বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা, তাহলে তার রেশ বাংলাদেশকেও পোহাতে হবে। ওখানকার জলগুলো বাংলাদেশ দিয়েই গড়িয়ে বঙ্গোপসাগরে যাবে। আর তখন বাংলাদেশে বন্যা না হয়ে যাবে কোথায়? কুড়িগ্রামের উত্তরের জেলাগুলোতে নিশ্চয় ভারী বৃষ্টিপাত হবে। পাহাড়ের ঢালুতে যেহেতু আমরা বাস করি আর আমাদের নদীগুলো যেহেতু তাদের নাব্যতা হারিয়েছে অতএব তুমুল বেগে নেমে আসা উচ্ছ্বসিত জলরাশিকে তারা ধারন বা বহন করতে পারবেনা। অতএব উপচে যাবে। অতিরিক্ত জলকে উদগীরণ করে দুপাশের গ্রামগুলোকে প্লাবিত করবে। নদীর কষ্ট ছড়িয়ে পড়বে জনপদে, মানুষের জীবনে।

তবে মানুষের জীবনে কষ্ট নেমে আসবে কথাটা সম্পূর্ণ সঠিক হল না। কারণ আমরা যারা বন্যায় ডুবে যাব না, শহরবাসী; সরকারের বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত জীবন যাপন করি (গ্রামের বাসিন্দাদের চেয়ে) তারা এই বন্যা এলে উৎফুল্ল হয়ে পড়ি। ব্রিজের উপর থেকে মানুষের দু:খ দেখে আহা উহু করি, কেউ কেউ মানবতার পরাকাষ্টা দেখাতে ত্রাণ নিয়ে নৌকাভ্রমণে মেতে উঠি। সন্ধ্যায় শহরে ফিরে পত্রিকা অফিসে জানাই “আমি কিন্তু আজ এত এত বস্তা ত্রাণ বিতরণ করেছি”। সত্যিই কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ।

Leave a Reply