…. নাকি অধ্যাস?

…. নাকি অধ্যাস?
সুশান্ত বর্মন

কামিনী ফুলের গন্ধে চারপাশ ভারী হয়ে আছে। শ্বাস নিতেও যেন কষ্ট হয়। এমন একটা মোহনীয় রাতেও অলীকের মন ভরে না। মনে হয় এ জীবনে তার সব প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। বিষাদের শুন্যতা থেকে সে এখন আর সাঁতরে তীরে উঠতে পারে না। তাই নিমজ্জনকেই অবলম্বন করেছে একান্ত করে। স্মৃতিতে আজকাল শ্যাওলা জমেছে খুব। তবুও তার ভ্রুক্ষেপ নেই। নির্দ্বিধায় জোরালো করে তুলছে ভুলতে চাওয়ার ইচ্ছেটা। ইচ্ছে করেই শরীরটাকে তুলোর মতো হালকা করে ভেসে বেড়াচ্ছে কোন স্বপ্নরাজ্যে। উচ্চারিত সত্যের মতো কিছু স্বপ্ন ছিল তার পথ চলার আহ্বান। অথচ ইতিহাসের নির্মম পরিণতির মতোই আর এক স্বপ্নের নির্মমতায় ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে তার সমস্ত স্বপ্নগুলো। তারুণ্যের উচ্ছলতা এতকাল তাকে জড়িয়ে রেখেছিল আষ্টেপৃষ্ঠে । তাই নিজেকেই তার চেনা হয়নি অনুভবের আয়নায়। আসলে অনুভবটাকে সে কখনও অনুভব করেনি। অথচ আজ অনুভব নামক অনুভূতিটাকেই সে মুছে ফেলতে চায় তার সবকিছু থেকে। পাগল হয়ে খোঁজে জীবনের সীমানা।

“বড্ডো ভুল হয়ে গেছে। সত্যি খুব ভুল হয়ে গেছে”। অলীক নিজের মনেই বলে ওঠে। হায়!  নিজেকে সীমাহীন করে তোলার কত মুহূর্তই না চলে গেছে নীরবে। কত না প্রভাত চলে গেছে অতীতে নিজেকে আবৃত রেখে। বাঁ হাত দিয়ে মাথার চুলগুলোকে পিছনে ঠেলে দিতে দিতে অলীক ছাদের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে পায়চারী করে। সময়গুলো হারিয়ে যেতে থাকে কালের গভীরে । তার কোন প্রতিক্রিয়া হয় না। সে পায়চারী করতে থাকে এবং করতেই থাকে। এক সময় অলীক ছাদের প্রান্তে রাখা বেঞ্চের উপর লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে।

ইদানীং অলীক প্রায় সবসময়ই স্বপ্নের মধ্যে ডুবে থাকে। কিন্তু সেই নবযৌবনের মতো স্বপ্নগুলো নিজে থেকেই আর মগজে আলোড়ন তোলে না। তাই সে স্বপ্ন দেখার জন্য সাহায্য নেয় ড্রাগের। যখন ড্রাগের পরমাণুগুলো শরীরের রক্তের মধ্য দিয়ে প্রবল বেগে ছুটে যায়, তখন তার সমস্ত দেহ মনে নেমে আসে এক অপার্থিব অনাবিল প্রশান্তি । নিজের হাতে তৈরী করা  স্বপ্নগুলোকে তখন বড় আপন মনে হয়। যৌবনের মধ্যাকাশে দাঁড়িয়ে আজ নিজেকেই সে প্রশ্ন করে কি পেয়েছি এই জীবনে? যেমন করে একটি মাত্র জীবনে বাঁচা উচিত ছিল তা কি বাস্তব হয়েছে? না হয়নি। যেদিন সে স্বপ্নকে বাস্তব থেকে আলাদা করতে শিখেছে, সেদিন থেকেই শুরু হয়েছে তার স্বপ্নভঙ্গ। তবুও প্রত্যাশিত স্বপ্নের প্রেরণাতেই সে পেরিয়ে এসেছে এতগুলো বছর। এর মাঝেই একদিন সে সেই রঙধনুটির স্বপ্ন দেখল, আর শুরু হল তার যত যন্ত্রণা। চোখ বন্ধ করলেই তার সমস্ত মগজ জুড়ে এক রঙধনু বিরাজ করে। তাও পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়ে নয়। তাই বোধহয় একে ঠিক স্বপ্ন বলা যায় না।  স্টিল ফটোগ্রাফির মতো আলাদা আলাদা কিছু ছবি। চমৎকার ফ্রেমিং, বিস্ময়কর গ্রাফিক্স, উজ্জ্বল রঙ আর রয়েছে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ব্যাকগ্রাউন্ড। এক পরিপূর্ণ ভালোলাগা শুরু হল অলীকের জীবনে। ছবিগুলো স্বপ্ন হিসেবে চমৎকার। তাই সে চেয়েছিল সেগুলো এক করে বাস্তবের সুতা দিয়ে মালা গাঁথতে। সে চেষ্টা করতে গিয়েই অলীক বুঝতে পেরেছিল তার অক্ষমতা। কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলনা যে, ‘স্বপ্নের সমাধি খোঁড়াই জীবন’। তার সমস্ত বিশ্বাস এক নিমেষেই হাওয়া হয়ে গিয়েছিল। কার লেখায় যেন পড়েছিল-
If you never have a dream
You will never have a dream come true.

মিথ্যা, মিথ্যা, প্রচন্ড মিথ্যায় ভরা এসব বক্তৃতা। মনের ভিতরে এক অনির্দেশ ক্রোধে অলীক চীৎকার করে ওঠে। গগনভাঙ্গা চীৎকারে সে চারপাশ কাঁপিয়ে দিতে চায়। স্বপ্ন ছাড়া কারও জীবন পূর্ণতা পায় না। স্বপ্ন আর জীবন অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়ানো থাকে সব সময়। তাই অলীক তার জীবনের সাথে স্বপ্নকে এক করে নিয়েছিল। তার বিশ্বাস ছিল অটুট। যা জীবন, তাই স্বপ্ন; যা স্বপ্ন, তাই জীবন। কিন্তু আসলে কি তাই? তার নিজহাতে গড়া চমৎকার আনন্দে ভরা রঙীন ছবির মতো স্বপ্নে যখন ভাঙন, ফাটল ধরা শুরু করল, তখন যেন তার ভিতরে এক প্রলয়ংকরী ঝড়ের হামলা হল। বোধ হয় হুমাযূন আজাদ বলেছিলেন-“ মানুষ যখন তার শ্রেষ্ঠ স্বপ্নটি দেখে তখন সে বাস করে তার জীবনের শ্রেষ্ঠতম সময়ে।” হাসি পেয়ে যায় অলীকের। এই যে তার স্বপ্নভাঙ্গার সময়ে এক স্বপ্নকে ভুলতে নেশায় ডুবে থেকে আরও রঙীন স্বপ্ন দেখা- এটাই কি তার জীবনের শ্রেষ্ঠতম সময়? নাকি শ্রেষ্ঠতম সময় সে পেরিয়ে এসেছে রঙধনুটার স্বপ্ন দেখার সময়ে।

জীবনে ভুল হয়ে গেছে অনেক। সত্যি এ জীবনে অনেক ভুল হয়ে গেছে । একটা মাত্র জীবনে তার যেমন করে বাঁচা উচিত। তেমন করে কি সে পারবে তার ভবিষ্যৎ গড়তে? বোধ হয় পারবে না। তাই প্রতিদিনই তার নিজেকে নিয়ে হতাশা বাড়ছে। নিজের অক্ষমতা প্রকট হয়ে ধরা পড়ছে নিজের কাছেই। এখন কিভাবে সে নিজেকে অতিক্রম করবে? যখন মুহুর্ত এসেছিল রঙধনু গড়বার তখন যেন হাতে আকাশ পেয়েছিল, আর আজ? আজ তার সমস্ত স্বপ্নগুলো হয়ে যায় অলীক রঙে ভেজা অসংলগ্ন কিছু ঘাস পাথরে। হায়! যদি এমন একটা যন্ত্র থাকতো যাতে স্বপ্নের কাঁচামাল ঢুকিয়ে দিলেই স্বপ্নটা বাস্তবে তৈরী হয়ে যেতো তবেই না পার্থিব হতো এ জীবনটা। কিন্তু তা যে হবার নয় তা এতদিনে অলীক বুঝে ফেলেছে। তাই সে মেতে থাকে নিজেকে ভুলে স্বপ্ন তৈরীর এক অনির্দেশ খেলায়।

অলীকের আচ্ছন্নতা এক সময় আবছা হয়ে আসে। আস্তে আস্তে সে চোখ খোলে। আকাশের দিকে তাকিয়ে দুঃখে ভরে যায় মন। মনে হয়, কেন যে এমন পূর্ণিমা আসে পৃথিবীতে? চাঁদ কি চিরকালের মতো হারিয়ে যেতে পারেনা কোন অন্ধকারে? ভেঙ্গে যেতে পারে না পূর্ণিমার নিয়মিত ছন্দতাল? এমন চাঁদনী রাতেই সে স্বপ্নটা দেখেছিল। সেদিন চাঁদ যেন আর আকাশে ছিল না, পৃথিবীতে নেমে এসে অলীকের বুকে অধিষ্ঠান নিয়েছিল। তখনি সেই স্বপ্নটি এসে প্রবল আলোয় অলীককে ভাসিয়ে নিয়েছিল সাতরঙের বন্যায়। অলীক আনন্দের প্রাবল্যে আকাশ ছুঁতে চেয়েছিল । অথচ? তাই পূর্ণিমা এলেই তার ভিতরে ফোঁটায় ফোঁটায় জমতে থাকে গাঢ় সব কষ্ট। ভুলতে চায় সে, কিন্তু পারেনা। কষ্টের পাহাড় তৈরী হতেই থাকে। তার সমস্ত শরীরে এসে জমা হয় লালনীল যত ক্যাকটাস। এক অসহ্য যন্ত্রণায় অলীক পৃথিবী থেকে পালাবার পথ খোঁজে। তখন প্রবল আচ্ছন্নতায় নিজেকে ডুবিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। নদীর গভীরে ডুব দেয়ার মত অলীক ডুবে যায় ড্রাগের খোঁয়ারিতে। অলীক চরম প্রশান্তির অনুভব খুঁজে পায় এই আচ্ছন্নতায়। নতুবা নিজের ভিতরে যে আলোড়ন বিস্ফোরিত হতে চায়, তাকে চাপা দিয়ে রাখা বড়ই কঠিন হয়ে পড়ে। যখনই সে স্বাভাবিক হয়, তখনই ধীরে ধীরে তার চোখে জমতে থাকে রাজ্যের ক্রোধ। ঘৃণা ধরে যায় সময়ের উপর আর বিশ্বাসের উপর থেকে বিশ্বাস উঠে যেতে থাকে। নিজেকে আর সে নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারে না এবং করে বসে তখন আরেকটা ভুল। তাই সে আবিষ্কার করে ফেলেছে নিজেকে বশে আনার মোক্ষম উপায়টি। অলীক জানে তার এ মনোভঙ্গী স্বাভাবিক নয়। তবু পূর্ণিমা এলেই তার সমস্ত শাসনের প্রাচীর ভাঙ্গতে থাকে। তখন যেন সে অন্য মানুষ হয়ে যায়। নিজের ভিতরে নিজেই কয়েকটা টুকরো হয়ে যায়। তৈরী হতে থাকে অদ্ভুত অদ্ভুত সব ইচ্ছা। আর ইচ্ছাগুলো খোঁচাতে থাকে তার ভয়ার্ত হাতদুটিকে, লাল টকটকে চোখদুটিকে আর নিস্প্রাণ মুখটিকে। বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মতো প্রচন্ড এক উচ্চ কন্ঠ অথচ  অনুচ্চারিত চীৎকার ছুটে বেড়াতে থাকে শরীরের প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। মনে হয় শরীর দীর্ণ হয়ে এক অপার্থিব আগ্নেয়গিরি বের হয়ে আসবে। মিশে যাবে জোৎস্নার প্রতিটি কণায়।

মাথায় প্রচন্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। ধীরে ধীরে মগজটা উত্তপ্ত হচ্ছে। অলীক দু’হাতে দু’কান চেপে ধরে গোঙাতে থাকে। তারপর নিজের অজান্তেই একসময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সকালে সূর্যের আলো চোখে লাগতেই তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। উঠে বসতে চায়, শরীরে খুব ক্লান্তি। উঠে দাঁড়াতে কষ্ট হয়। তবুও অলীক সোজা হয়ে দাঁড়ায়। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে সূর্যের দিকে। সূর্যটাকে আজ তার খুব সজীব মনে হয়। অলীক এক সময় নিজের মনেই বলে ওঠে-‘তাহলে আরও একটা রাত কাটল’। সূর্যটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজেকে খুব ক্ষুদ্র, তুচ্ছ বলে মনে হয় তার। মুখ ফিরিয়ে আস্তে আস্তে নীচে নেমে আসে। নিজের বিছানায় শুয়ে পড়ে অলীক। পূর্ণিমা শেষ হয়েছে, কিন্তু তার ছটা তো মুছে যায়নি তার মন থেকে। একে তাড়াবে সে কিভাবে? চেষ্টা করতে করতে তো আর একটা পূর্ণিমা এসে যাবে। অলীক আর ভাবতে পারেনা। কষ্টগুলোকে তার বড়ই আপন মনে হয়। ইচ্ছে করে সে তখন কষ্টগুলোকে বাড়তে দেয়। মাঝে মাঝে মনে হয় সত্যিই কি সে রঙধনুকে দেখেছিল। সেকি স্বপ্ন নাকি বাস্তব ছিল। কিন্তু স্বপ্ন তো কখনও এত জীবন্ত হয় না, তাহলে? নিজের প্রশ্নের কোন উত্তর সে নিজেই খুঁজে পায়না। আবারো তার ক্লান্ত শরীরটাকে অসাড় করে দেবার তৃষ্ণা গাঢ় হতে থাকে। চোখে নেমে আসে রাজ্যের অন্ধকার। পৃথিবীর প্রতিটি সাগর জমাট হতে থাকে তার সমস্ত বুকে। শরীরটা যেন থই থই ঢেউয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। পৃথিবী দুলছে এদিক ওদিক। দু’হাতে মাথার সমস্ত চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছা করছে।
বিছানায় উঠে বসে অলীক। পকেট হাতড়ে ড্রাগের সিরিঞ্জটা বের করে সে। প্রবল অনিচ্ছা ও অসহায়তার কাছে নিজেকে তার জিম্মী মনে হয়। হায়! রঙধনুটা থাকলে শক্ত হাতে হাল ধরা যেত। গাছের সবুজ ডালে যেভাবে কচি পাতারা উঁকি মারে সেভাবে নিজের ভিতর থেকে তুলে আনতো নতুন সকাল। উঠে দাঁড়াতো সে চোখ খুলে। কিন্তু এখন সে কি করবে? কেন সে এগিয়ে যাবে সামনের দিকে। কে আছে সেখানে অপেক্ষা করে? কেউ কি সত্যিই আছে? না নেই। অলীক বহু অভিঞ্জতায় জেনেছে কেউ কারো জন্য অপেক্ষা করে না। কেউ ভিজল কি ভিজল না তার জন্য যেমন বৃষ্টি অপেক্ষা করে না ঠিক তেমনি তার জন্যও কেউ অপেক্ষা করে নেই। কেনই বা থাকবে। কি আছে তার নিজেকে ছাড়া। এসব মনে পড়লে তার বড় কষ্ট হয়। কষ্টের ভীমরুলেরা সারা শরীরে হুল ফোটাতে থাকে। সে চায় না এমন অস্বাভাবিক সমকাল তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যাক বাস্তবতা থেকে। সে হারিয়ে যাক নিজের কাছ থেকে।
অলীক এক অপার্থিব হাসিতে চারপাশ ভরিয়ে দেয়। নিজের মনেই হেলাল হাফিজের কবিতাটা বলে ওঠে-
কষ্ট নেবে কষ্ট
হরেক রকম কষ্ট আছে
লালকষ্ট, নীল কষ্ট, কাঁচা হলুদ রঙের কষ্ট
পাথর চাপা সবুজ ঘাসের সাদা কষ্ট, আলোর মাঝে কালোর কষ্ট
একটি মানুষ খুব নীরবে নষ্ট হবার কষ্ট আছে
কষ্ট নেবে কষ্ট……..।

দুকলম পায়চারী

আখলাছ ও শহিদুল এসে বললো-
: দাদা চলেন বেড়িয়ে আসি।
: কোথায়?
: নদীর পাড়ে। একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।
বহুদিন নদীতীরে বেড়াতে যাওয়া হয়না। অথচ এখানে এলেই আমার মন ভালো হয়ে যায়। হেরাক্লিটাস বলেছিলেন-‘এক নদীতে দুবার অবগাহন সম্ভব নয়।’ আসলেই তাই। নদী কখনও পুরাতন হয় না। অনবরত প্রবহমান নদী বয়ে নিয়ে চলে নতুন জীবনের জলোচ্ছাস। কিন্তু ধরলা নদীর তীরে হাঁটতে এলে এমনটা আর মনে হয় না। নদীতীরের শহর রক্ষা বাঁধ বেদখল হয়ে গেছে। বাঁধের দুপাশের সরকারি জমিতে বছরের পর বছর ধরে বেড়ে উঠেছে অবৈধ জনবসতি। নদীভাঙনের শিকার নিরুপায় গ্রামবাসী, ভূমিদস্যু, ছিঁচকে চোর থেকে বড় অপরাধী, জনপ্রতিনিধিসহ সবাই ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিয়েছে নদীতীরের অবারিত প্রান্তরকে। দুপাশের বস্তিগুলোর মাঝখান দিয়ে একে বেঁকে চলে যাওয়া বাঁধটি দিনে দিনে সঙ্কুচিত হয়ে এসেছে। নগরবাসীর বিরক্ত দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে বস্তিগুলোতে দিনভর নিরন্ন মানুষের জীবননাটক মঞ্চায়িত হতে থাকে। আমরা গল্প করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের অনুচ্চ বাক্যগুলোকে ছিন্নভিন্ন করে এক মহিলার চিলচিৎকার চারদিক কাঁপিয়ে দিল। আখলাছ সাংবাদিক হওয়ায় তার কৌতুহল একটু বেশি। আমরাও তার পিছু পিছু হেটে গিয়ে জড়ো হওয়া লোকজনের পাশে দাঁড়ালাম।
: ঐ বেশ্যামাগীর মুখ যদি মুই ইট দিয়া থ্যাতলে না দিছং তাইলে মোর নাম ছমিরন নোয়ায়।
: ক্যা তুই উয়াক দোষ দেইস ক্যা? তোর স্বামীক ধর। তায় যদি বিয়া করা বউক ঘরোত থুয়্যা অন্য চেংরির সাথে নাং নাগায়………
আখলাছ মুহূর্তেই ঘটনাক্রম বুঝে ফেলে। সে তার নোট খাতাতে ঘটনাটি লেখতে গিয়েও লেখেনা। সে জানে এদেশের নীতিবাদী সমাজে পুরুষ মানুষের এমন চরিত্রস্খলন দোষের কিছু নয়। ঘটনা যদি বিপরীত হতো। মহিলাটিই যদি পরপুরুষের সাথে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে যেতো তাহলে তা অবশ্যই খবরের মর্যাদা পেতো। সমাজের নীতিবাদী পুরুষেরা এ ধরণের খবর পড়তে আনন্দ পায়। আধুনিক বিশ্বের দিকে পিছন ফিরে থাকা এ সমাজের রূপ এমনই। এতে অবাক হবার কিছু নেই। এখানে নারীবাদ, স্বাধীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদি মানবিক মূল্যবোধের ভুল ব্যাখ্যাকে সবাই সমর্থন করে। মানুষের প্রতি প্রবল অবিশ্বাস নিয়ে তারা প্রথমেই খুঁজে পায় নারীবাদ বা স্বাধীনতার অপব্যাখ্যাগুলোতে। এই জটিল সমীকরণে নিজেদেরকে অপাংক্তেয় মনে করে আমরা পিছিয়ে আসি। পিছন ফিরতেই আমার সাথে ধাক্কা লেগে একটি শিশু মাটিতে পড়ে গেল। আমি মমতার সাথে তাকে তুলে দাঁড় করিয়ে দিলাম। ৩/৪ বছর বয়স হবে। পেটটা কৃমি দিয়ে বোঝাই। সারা শরীরে একটুকরো কাপড় নেই। মাথার চুলের ফাঁকে ফাঁকে বালু চকচক করছে। নাক দিয়ে শ্লেষা বের হয়ে এসে থুতনি-গলা-বুক ভিজিয়ে ফেলেছে। নাগরিক সংস্কৃতি মোড়ানো আমার শরীর ঘিনঘিন করে ওঠে। গতকাল বিশ্ব শিশু দিবস গিয়েছে। কলেজ মোড়ের লাইব্রেরিতে ‘শিশু অধিকার ও প্রতিবাদী ফোরাম’ আয়োজিত ‘বিশ্ব শিশুদিবস: সমকালীন পৃথিবী ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক আলোচনা সভার প্রধান বক্তা ছিলাম আমি। অন্যান্য বক্তাদের কথা মনোযোগের সাথেই শুনেছিলাম। অন্যদের জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য শুনে নিজেকে খুবই হীন মনে হচ্ছিল। সম্ভবত সে জন্যেই আমার বক্তব্য দীর্ঘ করতে পারিনি। সভাশেষে শহিদুল-বাবু-সাজু-নারায়ণ-রফিক-বাসু এরা ঠেসে ধরেছিল। কেন বিশেষ কিছু বলিনি? ওদেরকেও তেমন কিছু বলিনি। আজ শহিদুলকে বলতে ইচ্ছে হলো। পকেট থেকে একটা চকলেট বের করে শিশুটির হাতে দিয়ে শহিদুলকে বললাম: এই শিশুটিকে দেখো। এটা কি বাস্তব নাকি কল্পনা? এই দৃশ্য যতদিন বাস্তব থাকবে ততোদিন সুধী সমাবেশে বক্তৃতা দিয়ে কিছু হবে না। কথা বলার উপর তো কোন ট্যাক্স নেই। তাই ইচ্ছে করলেই যা খুশি তা বলা যায়; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হবেনা, হয়না, হয়নি।
আমরা হাঁটতে হাঁটতে ‘গ্রোয়েন বি’তে গিয়ে বসলাম। আখলাছ এতে জোর আপত্তি জানিয়েছিলো। ওর ইচ্ছা ‘গ্রোয়েন এ’ তে বসার। সেখানে ফুলবাগান আছে, সজ্জাপ্রবণ নারীরা আছে; সেসব ছেড়ে এই বর্ণহীন ‘গ্রোয়েন বি’তে বসা যে আসলে চরম বোকামী তা বোঝাবার চেষ্টা করতে লাগলো।
শহিদুলের সাথে পাশের গ্রামের তাহের আলির দেখা হয়েছে। তাহের আলি ছেলেটা পোষাকে বেশ পশ্চিম ঘেঁষা। তার হাইকেডস, স্কিনটাইট ফেড জিন্স ও লেদার জ্যাকেট ও মাথার গোল কিস্তি টুপিটি দেশের অর্থনীতির গতিময়তার কথা প্রকাশ করছে। সেই ছেলেটি যখন দেশের সিনেমাগুলোর অশ্লীলতার কথা বললো তখন অবাক হলাম। সমসাময়িক সিনেমা নিয়ে উন্নাসিক অনেকের মতো সেও আমাকে বোঝাতে লাগলো নীতির কথা, অশ্লীলতা ও ধর্মবোধের কথা। শহিদুল বলছিলো: ‘স্বকালের সিনেমার অশ্লীলতা নিয়ে যাঁরা সোচ্চার তাদেরকে আমার প্রথম থেকেই সমাজ বিচ্ছিন্ন মনে হয়েছে। এরা নিজেকে সুস্থ ধারার সংস্কৃতিসেবী বলে মনে করে একটা আলগা আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে চায়। বর্তমানের সিনেমাতে যে স্বল্প পোষাক দেখা যায় তা যে মূলত সময়ের দাবি তা বোঝার জন্য যতোটা মননশীল হওয়ার দরকার এরা ততোটা নয়। ৭০ বা ৮০’র দশকে  শাবানা-ববিতারা ব্লাউজে প্রচলিত মাপের চেয়ে বড় মাপে গলা বা পিঠ কাটতেন। ভ্যাম্প চরিত্রের নায়িকাটি তৎকালীন প্রেক্ষাপটে স্বল্প পোষাক পড়েই নাচগান করে ভিলেনের মন জয় করতো। আমাদের তথাকথিত সুস্থ্য সংস্কৃতিবাদীরা যে সিনেমাটিক সহিংসতার কথা বলতে চান তাতো কোন মিথ্যা কাহিনী নয়। সমাজে এগুলোর চেয়েও ভয়ানক ও সহিংস ঘটনা ঘটে থাকে। সামাজিক সহিংসতার হিংস্র থাবা থেকে নিরূপদ্রব গৃহকোণপ্রত্যাশী থেকে লাইব্রেরিতে গবেষণারত গবেষক কেউ নিঃশঙ্ক নয়। মাসুদ খানের বর্ণনা স্বসমাজে কতই না বাস্তব- ‘পাঠাগার থেকে চোখ মুছে ফেরে ব্যাধ’। কোন কোন ক্ষেত্রে এই সংস্কৃতিসেবীরাই ওইসব ভয়ানক ঘটনায় নিয়ামক ভূমিকা পালন করে থাকেন। ফলে নীতিহীনদের নীতিবাদীতার ঠেলায় সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের বিনোদনের সহজ পথটিও কন্টকপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যে সব সিনেমাকে তারা অশ্লীল বা সহিংস বলে আক্রমণ করে সেইসব সিনেমার দর্শক সংখ্যা বেশি। দেশের বেশিরভাগ জনগণ স্বকথিত নীতিবাদীদেরকে সমর্থন করে না। এখন যদি আমরা বাংলা সিনেমাকে অশ্লীল বলি তাহলে কি এটাই স্বীকার করা হয় না যে দেশের বেশিরভাগ জনগণ তথাকথিত অশ্লীলতাকে সমর্থন করছে। এখানে অশ্লীলতা বলতে শুধু নারীদের স্বল্পপোষাককেই চিহ্নিত করা হচ্ছে, পুরুষের স্বল্পপোষাককে মনে করা হচ্ছে না। অশ্লীলতা যদি খারাপ হয় তাহলে এর জন্য দায়ী কে? কার ব্যর্থতার পাপে দর্শক বা দেশের বেশিরভাগ জনগণের রুচি এমন নিম্নগামী হলো? আমার কাছে সব সময়ই সংস্কৃতিবাদীদেরকে দোষী মনে হয়েছে। অসংখ্য ব্যর্থতা আর ভন্ডামীর আড়ালে তাদের যে জীবনধারা তার ফল হলো এমন যে নাটকের টিকিট বিক্রি হয় না কিন্তু অশ্লীল(?) সিনেমার টিকিট পাওয়া কঠিন। এরা সংস্কৃতিবিষয়ে এমনই পন্ডিত যে তথাকথিত অশ্লীল সিনেমার অশ্লীলতাটাই তাদের চোখে পড়ে কিন্তু অভিনেতাদের অভিনয় প্রতিভার ব্যর্থতার কথা কেউ বলে না। অর্থাৎ আমি মনে করি পোষাকের স্বল্পতা আসলে কোন সমস্যা নয় আসল সমস্যা হলো পরিচালকদের শিল্পরুচিবোধ এবং অভিনেতাদের অশৈল্পিক ও অভিনয় প্রতিভাহীনতা। অশ্লীলতা বা সন্ত্রাস নয় চিন্ত্রার দরিদ্রতাই আমাদের প্রধান শত্র“।’ শহিদুলের এতোসব যুক্তির কোনটাই তাহের আলির মনপুত হচ্ছে না। আমি ‘গ্রোয়েন এ’ এর দিকে পা বাড়ালাম। আখলাছ খুশী হলো। একটি সিমেন্টের বেঞ্চে একজোড়া নারী-পুরুষ ঘনিষ্ঠভাবে বসে আছে। সামনের গোল ঘরটির ভিতরে ৬/৭ জন তরুণ চিৎকার করে করে নিজেদের মধ্যে গল্প করছে। আখলাছ গ্রোয়েনের কিনার দিয়ে নদীর কাছে নেমে গেলো। এখন নদীতে জল তেমন নেই। গ্রোয়েনের এপাশ থেকে নদীর কিনার দেখা যাচ্ছে না। আখলাছ বেশ দ্রুত নিচে নেমে গেলো।
কয়েকজন বালক এসে আমাদেরকে ঘিরে দাঁড়ালো। কেউ গান গেয়ে দু’টাকা চায়, কেউ হাতপা টিপে দেয়ার বিনিময়ে দু’টাকা চায়। আমি তাহের আলিকে জিজ্ঞাসা করলাম: ওই যে তরুণ নারীপুরুষ হাতে হাত রেখে বসে আছে আর এই ছেলেগুলো টাকা চাচ্ছে এই দুটোর মধ্যে কোনটা সমস্যা? তাহের সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো: এই ছেলেরা সমস্যা হবে কেন? এরা তো পরিশ্রমের বিনিময়ে টাকা চাচ্ছে। ছিনতাই করছে না। নিজে নিজে স্বাবলম্বী হবার পথ অল্প বয়স থেকেই খুঁজে নিচ্ছে। আর ওই নারীপুরুষ দুজনতো ইসলাম বিরোধী কাজ করছে। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে মানুষের মধ্যে এই ধরণের বেশরিয়তি মনোভঙ্গী বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কিন্তু ইচ্ছে করলো না; বরং নদীর দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগছে। একটা শুশুক তখন থেকে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। কোন মাছকে তাড়া করেছে হয়তো। শৈশবে এই ধরলা নদীতে আমি সারাবছরই শুশুক দেখতাম। সে সময় নদীর গতিপথ ভিন্ন ছিলো। এই অঞ্চলের সুখ্যাত সানাই বাদক ‘সুলকু’ এর নামানুসারে গড়ে ওঠা বর্তমানের ‘সুলকুর বাজার’ এর পা ধুয়ে ধরলা বয়ে যেতো। তখন নদীর নাব্য বেশি ছিলো। বিভিন্ন রকম পরিযায়ী পাখির হাট বসে যেতো চরাচরে। নদীর দুই তীরের খাড়া ঢালে অসংখ্য খরগোশ বাস করতো। একবার একটি খরগোশকে তাড়া করতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়েছিলাম ঝোপের উপরে। সঙ্গে সঙ্গে অনেকগুলো খরগোশ ঝোপ থেকে বের হয়ে চারিদিকে ছুটে পালালো। আমি চোখভরা বিস্ময় নিয়ে বিমূঢ় দাঁড়িয়েছিলাম।
আখলাছ আসলে এতক্ষণ নদীর জলে দুপা ডুবিয়ে পাথরের উপর বসে একজন তরুণীর সাথে কথা বলছিলো। সন্ধ্যার আভাসে চারদিক গাঢ় হয়ে আসতেই ওরা উঠে পড়লো। আমার সামনে এসে আখলাছ পরিচয় করিয়ে দিলো।
: দাদা, এর নাম শায়লা। আমরা আগামী মাসে বিয়ে করছি।
আমি আখলাছের অকপট বক্তব্যে মুগ্ধ হলাম। শ্যামলা রঙের শায়লা কপালে টিপ পড়েছে। বড় সুন্দর করে হাসতে জানে।
ফিরে আসতে আসতে শায়লার একটি কথা বারবার মনে পড়ছিলো। ও বলছিলো ধরলা ব্রিজের কথা।
: চারপাশের হাজারো নিরাশার মাঝে আমাদের সমস্ত আশাগুলো গড়ে তুলবে ভবিষ্যতের স্বপ্নসেতু।