প্রত্ননিমগ্ন ‘পাখিতীর্থদিনে’

দর্শনের প্রধান দুটি শাখাতেই মানুষের প্রাচীন ইতিহাসের প্রশংসা করা হয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় ভাববাদী মতে সুদূর অতীতে ‘সত্যযুগ’ নামে এক কাল ছিল। সেসময় সবাই ছিল সত্যবান। কেউ কোনো মিথ্যা কথা বলতো না, কোনো অসৎ কাজ করতো না। এখনও এদেশের সাঁওতাল, গারো, ওঁরাও প্রমুখ প্রত্নমানুষদের অভিধানে ‘পরশ্রীকাতরতা’, ‘ধর্ষণ’ প্রভৃতি শব্দ অপরিচিত। আধুনিক বস্তুবাদী মতে ইতিহাসপূর্বকালে ‘আদিম সাম্যবাদী সমাজ’ নামে একটি প্রাকৃতিক সমাজব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। সে সমাজে সকল মানুষ সমান ছিল। কেউ কারও তুলনায় কোনো অজুহাতে বিশিষ্ট ছিলনা। প্রামাণ্য ইতিহাস হিসেবে এর কোন ক্ষণ স্বীকৃত নয়, তাই বলে সুস্থ সমাজের এই ধারণাটি আমাদের কল্পলোক পরিত্যাগ করেনি। এই চিরনতুন, চিরকাক্ষিত, আনন্দময় ও ধ্রুপদী স্বপ্নলোকের রশ্মিপ্রকাশ স্বদেশে সমকালে বিলুপ্ত। স্বকালের যাবতীয় মিথ্যাচার, প্রবঞ্চনা, অনৈতিকতা, অসঙ্গতি, সহিংসতা অর্থাৎ সার্বিক স্ববিরোধীতা মানুষের মানসলোকে আজ বেকেটের দুঃস্বপ্নগুলোকে মূর্ত করে তুলেছে। ফলে শিল্পজগতের সবখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এক বিরান মরুভূমি। বাংলাদেশের কাব্যজগতও এই প্রভাবের বাইরে থাকতে পারেনি। আশির দশকের শেষাংশে এবং নব্বই দশকে এসে এই বন্ধ্যাত্বের কিঞ্চিত উপশম আমরা অনুভব করি। চারপাশের উষর কাব্যমাঠের মাঝে মাঝে কিছু মরুদ্যানসদৃশ সবুজ বাগান আমাদের দৃষ্টিগোচর হতে থাকে। এরকমই একটি তৃণভূমি সৃজন করেছেন মাসুদ খান তাঁর ‘পাখিতীর্থদিনে’ কাব্যগ্রন্থে।

বাংলাদেশ অঞ্চলের হাজার বছরের পুরনো মানুষের প্রতি ভালোবাসা মাসুদ খানের কবিতায় মর্মবাণীরূপ ধারণ করেছে। তিনি জানেন তাঁর রক্তে যে ডিএনএ জেগে আছে তা বৈদেশিক নয়; কোনো মরুভূমির রুক্ষ্ম নির্জীবতায় তাঁর রক্তকোষ বেড়ে ওঠেনি। বাংলার ভূমিজাত মানুষেরা তাই তাঁর কবিতায় কথা বলে ওঠে। প্রতিবেশের ভেজা মাটি, ভেজা বায়ু, ভেজা আকাশ ও আর্দ্র মানুষ তার মননে কখনো ঘুমায় না। তিনি দেখেন হাজার বছরের কালো মানুষের উত্তররক্ত বহন করছে তাঁর শরীর। এ ইতিহাস অবিস্মরণীয়। মাসুদ খানের মননে প্রত্নঐতিহ্য ধূসর নয়। তাঁর মানসভূমির সম্পূর্ণ আলোকিত করে আছে বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস, বিজ্ঞানচেতনা, নিজস্ব নন্দনতত্ত্ব ও ভবিষ্যতের স্বপ্নিল সাম্যসমাজ। প্রতিষ্ঠানের সেবাদাসদের মতো তিনি সমাজের বহিরঙ্গ দেখে মুগ্ধ নন। রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক বা ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদের শিকলে নিজেকে তিনি অন্যদের মতো বিকিয়ে দেননি। তাঁর জীবনমুখী দু’চোখে ভবিষ্যতের সাম্যসমাজ ধোঁয়াটে হয়ে যায়নি। মাসুদ খানের কবিতাপাঠে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে তিনি যেন কবিতার জন্যই কবিতা লিখেছেন। তিনি যেন Art for Arts shake এর বীজকে নিজের মগজে গেঁথে নিয়েছেন। কিন্তু সন্ধানীপাঠক মাত্রই জানেন মাসুদ খান এত স্থূল নন। বরং ত্রিকালদর্শী প্রজ্ঞা নিয়ে তিনি এঁকেছেন ভবিষ্যতের কাল। শুধু শিল্প নয় সমাজের প্রতিও প্রবল দায়িত্ব নিয়ে রচনা করেছেন কবিতার কথামালা।

এই ভারতভূমির সার্বিক অসামঞ্জস্যতা নিয়ে প্রথম প্রমূর্ত বিদ্রোহ করেন গৌতমবুদ্ধ। এ ইতিহাস তাঁর কবিমনে একটি অন্যতম দৃশ্যকল্পের সৃষ্টি করেছে। মাসুদ খান দেখেন গৌতম বুদ্ধের কালে-
“সার্থবাহ নিয়ে আসে ঝলমলে বাসকপাতার কোলাহল
দুঃখ সেরে যায়, অসুখ সারে না।”(বৈশ্যদের কাল)

এই বাস্তবতায় বুদ্ধ নির্ভার-নিশ্চিত থাকতে পারেননি। মানুষের জীবন আঁকড়ে থাকা সমস্যা সমাধানের দুর্মর আকাঙ্ক্ষা তাঁকে জাগিয়ে তোলে বিলাস জীবন থেকে। এক সুন্দর স্বপ্নের আশায় তিনি বেড়িয়ে পরেন রাজপুত্রের খোলস থেকে।

“…একদিন ঘুমন্ত স্ত্রী আর পুত্র রেখে ঘন রাত্রে
নিরুদ্দেশে যায়
নিরঞ্জনা নদীকূল শুধু কাঁপে অকূল তৃষ্ণায়।” (বৈশ্যদের কাল)

মাসুদ খান কল্পনায় যেন অনুভব করেন এরপর-
“ধীরে ধীরে এই ভূমিপৃষ্ঠে ফিরে এলো বৈশ্যদের কাল।”(বৈশ্যদের কাল)
কিন্তু পরবর্তী ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। মানুষের সার্বিক মুক্তির আশা বিবর্ণ করে দিয়ে-
“…ধুলিঝড় হলো, হিমবাহ গেলো শতযুগ।” (বৈশ্যদের কাল)
তারপর বোধহীন বোধির আক্রমণে বুদ্ধের বোধি এই ভূখণ্ডে ক্রমাগত রঙহীন নির্জীব হয়ে যায়। শুধু ইতিহাসে লেখা হয়ে থাকে-

“ঐখানে হৈ হৈ রৈ রৈ পঞ্চকাণ্ড মেলা বসতো
হাজার বর্ষ আগে
আজ শুধু এক জোড়া নিরিবিলি জলমগ্ন বৃক্ষ বাস করে।” (বৈশ্যদের কাল)

মানুষ প্রথমত এবং প্রধানত বস্তু। তাই সে বেশিরভাগ সময়ই চরম বস্তুবাদী। বস্তুকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে; শ্বাস হিসেবে শরীরের ভিতরে প্রবেশাধিকার দেয়। বস্তু দিয়ে লেখে, বস্তু পড়ে, বস্তু ব্যবহার করে; তাঁর চারপাশের যা কিছু গ্রহণযোগ্য তার সব কিছুই বস্তু। এমন চরম বস্তুবাদী মানুষকে আধ্যাত্মবাদ বিচার করে ভিন্নভাবে। প্রাণীজগতের সবচাইতে বুদ্ধিমান জীব মানুষের দিকে কবি তাকাতে চান যুক্তিবাদী দৃষ্টিতে। কিন্তু তিনি দেখেন সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন দর্শন মানুষকে বিশ্লেষণ করতে চায় ভিন্ন উপায়ে। মাসুদ খান মানুষের প্রচলিত ও বহুল বিবৃত কোন কোন সংজ্ঞায় বিব্রত বোধ করেন। মানুষ সম্পর্কিত দার্শনিক তত্ত্বগুলো তাঁর মনে ভিন্ন অনুভূতির সৃষ্টি করে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন বহির্জগতের ভিত্তিতে নয় অন্তর্জগতের ভিত্তিতেই মানুষকে সংজ্ঞায়িত করা উচিত। আর এ লক্ষ্যেই তিনি ‘মানুষ’ নামে উপস্থাপন করেছেন তিনটি কবিতা। প্রথম কবিতায় তিনি মানুষকে সেমেটিক মীথের প্রতিফলনে খুঁজেছেন। ব্যর্থ ইঁদুরশিকারী (যে আবার ইঁদুরছানার কাতর চোখ দেখে শিকারে ক্ষান্ত দেয়), দুধমাছচোর, উঞ্ছজীবী বিড়ালকে উত্যক্ত প্রতিপালক দূর বালিচরে বস্তাবন্দি করে ছেড়ে দেয়। বিতাড়িত বিড়াল নিরিবিলি জীবন থেকে উৎপাটিত হয়ে নির্বাসিত হয় মরুরঙ চরভূমিতে। তার মগজে শুধু ভেসে বেড়ায় প্রাক্তন প্রভূর দূরনিয়ন্ত্রিত সংকেত। কিন্তু উপায় নেই। চারপাশের অথৈ জলরাশি তাকে অনিচ্ছাকৃত জীবন যাপনে বাধ্য করে তোলে। মানুষ নামাঙ্কিত দ্বিতীয় কবিতাতেও তিনি মানুষকে দেখেন সেমেটিক আয়নায়। এখানে মানুষ চিহ্নিত হয়েছে আপেল চোর হিসাবে। পেছনে তাড়া করা সাপের ফণা ক্লান্ত চোর মানুষটিকে শান্ত থাকতে দেয়না। কবি মানুষের এমন হীন সংজ্ঞায় বিব্রত; এমন বিকটভাবে বিশেষায়িত নিজেকে স্থাপন করবার জন্য পাত্র খুঁজে পাননা। ‘মানুষ’ শীর্ষক তৃতীয় কবিতাটিতে কবি মানুষের এমন পূর্বনির্ধারিত অপমানকর বিশেষণকে প্রত্যাখ্যান করেন। সরাসরি অস্বীকার করেন নিজের আরোপিত চোরবংশজাত ঐতিহ্যকে।
“তোমাদের এই বংশের কেউ নই,
না তস্করকুলের কেউ।” (মানুষ)

নিবিড় পর্যবেক্ষণে তিনি জেনেছেন প্রাতিষ্ঠানিক দাসদের মানসদিগন্ত। প্রতিষ্ঠানপ্রেমিক আমরা দাসখত লিখেছি জীবন ও সমাজের কাছে। জেনেছি মর্ম সত্য নয় রূপ সত্য। আমাদের কাছে এযুগে প্রকল্পব্যবসা মর্যাদা পায় সমাজসেবা বলে। ফলে-
“বীজায়ন প্রক্রিয়া, তারও পূর্বপার থেকে
জন্মদিন ভেঙেচুরে, দেহ তো হয়ই নি, দৌড়ে আসে সীমারেখা।
প্রকল্পের প্রভাবে জোরালো সোডিয়াম জ্বলে।” (প্রতিষ্ঠান)

মাসুদ খান পেশায় একজন প্রকৌশলী। যন্ত্রজীবী কবি যন্ত্র, ধাতু, বস্তু, জড়, কৃত্রিম, অপ্রাণজ বিজ্ঞানের দিকে তাকালে দ্বিধাহীন হয়ে যান। যন্ত্রের ভিতরের যন্ত্রটিকে তিনি নিমেষে বুঝে ফেলেন। তবে তিনি যন্ত্রবাদী নন। তাই তাঁর রচনায় বিজ্ঞান উপস্থিত হয় নিজস্ব সত্যবোধ ও ন্যায়নিষ্ঠতা নিয়ে। ফলে তাঁর কবিতা সমৃদ্ধ হয়েছে, লাভ করেছে আধুনিক যুগের নৈকট্য। তিনি বাংলা কবিতার গতিপথে একটি নতুন পথ যেমন তৈরি করতে পেরেছেন তেমনি কবিচরিত্র বা কবিত্বের সংজ্ঞা সম্পর্কেও তৈরি করেছেন নতুন দর্শন। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন আধুনিক যুগের কবিদের ভাববাদী হওয়াটা ততোটা জরুরি নয় যতোটা জরুরি প্রয়োজন বিজ্ঞানসচেতন হওয়ার। বিজ্ঞানের যুগে বাস করে যে কবি ভাববাদী হয়ে ওঠে সে তো পুরনোবাদী, তাকিয়ে থাকে অতীত গহ্বরের দিকে। তিনি জানেন এমন কোনো শর্ত নেই যে কবিদের বিজ্ঞানসচেতন হওয়া যাবেনা। তাহলে একালে বাস করে কেনো বিজ্ঞানবিমুখ থাকা; কেনোই বা বিজ্ঞান থেকে মুখ ফিরিয়ে প্রাচীন চেতনার দাসত্বে নিজেকে বন্দি করা। সমকাল সম্পর্কে যে মানুষ অসচেতন সে নিজেই তো যান্ত্রিক, মৃত। এই সচেতনতার জন্যই তাঁর কবিতায় বিভিন্ন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট শব্দ বারবার এসেছে। প্রতিদিনের যাপিত জীবনকে তিনি এড়িয়ে যেতে চাননি। ‘অকটেন’, ‘ম্যাঙ্গানিজ’, ‘প্রাণীবিজ্ঞান’, ‘স্বর্ণ’, ‘প্লাস্টিক’, ‘ফ্লাডলাইট’, ‘পারদস্তম্ভ’, ‘অম্লজান’, ‘সোডিয়াম’, ‘সিলিকন’, ‘রেডিও তরঙ্গ’, ‘ইঞ্জিন’, ‘গিয়ার’, ‘স্পিডোমিটার’, ‘ভূগোল’, ‘ইলাস্টিক’, ‘সুপারনোভা’, ‘গ্রাফাইট’, ‘ব্লাকহোল’, ‘ইলেকট্রন’ প্রভৃতি শব্দগুলি জীবনের প্রাত্যাহিক পরিচিতি নিয়েই তাঁর কবিতায় এসেছে। তিনি জানেন বিজ্ঞানচেতনা মানে যন্ত্র ব্যবহারে পারদর্শীতা নয়, যন্ত্রের মৌলদর্শনকে ধারণ করা। তাঁর বিজ্ঞানসচেতনতা কোনো লোকদেখানো বিষয় নয়। তাই আধ্যাত্মিক নয় বরং বৈজ্ঞানিক সৃষ্টিতত্ত্বকে তিনি ধারণ করেন মনেপ্রাণে। ঐতিহাসিক বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করেন সমাজকে। এজন্যই তিনি অকপটে বলে যান প্রাণীর সৃষ্টিতত্ত্ব ও মানুষের সামাজিক ইতিহাস-
“ডাঙায় প্রথমে খ’সে গেলো বাঁকা লেজের অহং
ধীরে ধীরে গুল্মীভূত হলো দেহ।”(ত্রিজ)
সমাজ ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় শিকারী জীবন কাটিয়ে মানুষ একে একে চলে আসে বর্তমানের পারমাণবিক জীবনে।
“কামারশালার গনগনে কান্তলোহা, আগুনের ফুল আর ফুলকার অক্সিজেনে সখ্য হলো।” (ত্রিজ)
এই ইতিহাস আমাদের অচেনা নয়। কিন্তু একালে বসে মাসুদ খান বেদনার সাথে দেখেন-
“কংকালের লোভে ব’সে ব’সে ঝিমোচ্ছে
পৃথিবীর নিঃস্ব প্রাণীবিজ্ঞান।”(ত্রিজ)

এবং
“পাঠাগার থেকে চোখ মুছে ফেরে ব্যাধ”। (ত্রিজ)
মহাকালের সামনে দাঁড়িয়ে কবি দেখেন¬
“ধর্ম ও বীর্যবাসনা প্রবল হ’লে জাগে টান…….
ক্ষুধায় ধর্মলালায় যৌনে ও প্রেমে
হরিণ ও চিতার রূপচিত্রগতি অবিরল
চকচকে যুগ্ম ট্রাজেক্টরি।” (একটি চিত্রিত হরিণের পেছনে একটি চিত্রিত বাঘ ছুটছে)
আপাতদৃষ্টিতে মানুষ যূথপ্রেমী হলেও প্রধানত সে নিঃসঙ্গ। সমাজের একক মানুষের জীবন জীবনব্যাপী সঙ্গীহীন সাথীহীন। শত কোলাহলের মাঝেও মানুষের একাকিত্ব কাটেনা। পরিজন বেষ্টিত জীবনেও মানুষ নিরন্তর একা হয়ে থাকে। আত্মবাদী বর্তমানকালে মানুষ নিরন্তর নিজেকে আবিষ্কার করতে চায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাফল্যের চূড়ায়। কিন্তু প্রতিষ্ঠার স্বীকৃতিও মানুষের অন্তর্মুখীতা দূর করতে পারেনা। সাফল্যছোঁয়া মানুষ তাই বুঝে ফেলে এই বিজন জীবন তার নিজেরই মাত্র। এই মিত্রহীন মানুষ অনবরত খুঁজে বেড়ায় একাকিত্ববিরোধী বিভিন্ন বস্তুমালা। একাকিত্বের নিঃসীম অন্ধকারে দাঁড়িয়ে মানুষ খুঁজে নেয় যূথধারণার মৌলিক দর্শনটিকে।
“ঐ বাঁধে নির্জন সভাপতি থাকে।
সন্ধ্যাভাষা জানে।” (ঐ বাঁধে নির্জন সভাপতি থাকে)
মাসুদ খানের কবিকীর্তির অনবদ্য উপহার উপমা বৈচিত্র। তাঁর কবিতার উপমা ও রূপকগুলো বাংলা শব্দভাণ্ডারে একাধিক নতুন শব্দবন্ধ সংযুক্ত করেছে। ‘কীটপুত্র’, ‘ঐশী পর্যটন’, ‘অণ্ডআত্মা’, ‘আলকাতরার জলাশয়’, ‘ক্রোমোজমের উল্লাস’, ‘রাত্রিগ্রস্ত’, ‘শাদা হিংসা’, ‘ছাইরঙা সন্ন্যাস’, ‘অগ্নিপাহাড়’, ‘অন্তরঙ্গ রোম’, ‘ঘন চৈত্রদুপুর’ প্রভৃতি উপমা/ রূপক বাংলা সাহিত্যে একেবারে মৌলিক । ‘চেরাগজন্ম’ কবিতায় সমসময়ের চাপে বাংলার এক চারণের জন্ম বৃথা যায়। এর ফলে যে মহাবিপর্যয় ঘটে তার রূপক অভিনব ও অভূতপূর্ব।
“চারণ, তোমার চেরাগজন্ম বৃথা যায়
মন্দ গাহিছে লোকে দিকে দিকে পুনর্বার
………………………………………..
চিমনি চিড় খায় আজ উন্মার্গ জলের ছিটায়
চিমনি চিড়ে যায় আজ চক্রবাল থেকে
তেড়ে আসা অভিশাপে, ভর্ৎসনায়।” (চেরাগজন্ম)
মাসুদ খানের রচনায় ‘চারণ’, ‘শ্রমণ’, ‘নিষাদ’, ‘ব্যাধ’, ‘শুদ্র’, ‘হরপ্পা’, ‘ধীবর’, ‘টোটেম’ প্রভৃতি প্রত্নইতিহাস ও নৃবিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট শব্দগুলো বারবার এসেছে। এই শব্দগুলো শত অতীত মনে হলেও তা পুরান, রূপকথা, অলৌকিক, মীথ বা পরকালবাসী কোনো শব্দ নয়। এই শব্দগুলো প্রাক্তন মনে হলেও পরদেশী নয়। সেমেটিয় নীতিবোধের অবাধ প্রচলন আমাদের প্রান্তিক সমাজে যে স্থায়ী রাত্রিকালের সৃষ্টি করেছে তার প্রতি তিনি আশরীর ক্রোধ ও আমাদের নিজস্ব অর্থাৎ নিষাদ, শবর, অষ্ট্রোলয়েডদের জীবনের প্রতি প্রবল কাক্সক্ষা বোধ করেন। তাই তাঁর মননে প্রতœইতিহাস কোনো সেমিনার কেন্দ্রিক শব্দচিত্র সাজায় না। তিনি নিজের রক্তের দিকে, কোষের দিকে, ক্রোমোজম-ডিএনএ’র দিকে তাকিয়ে নিজেকেই খোঁজেন। প্রতিষ্ঠিত স্ববিরোধীতা ও ভণ্ডামোর রাজত্বে বাস করতে করতে ক্লান্ত তিনি অতঃপর সচকিত হয়ে ওঠেন। দেখেন প্রত্নমানুষেরা আজ আর পরাজিত নয়। কারণ আজ এসেছে ‘উর্ধ্বগমনের দিন’-

“পুরাতন বস্তু থেকে উত্থিত সেই কবেকার
ব্রাত্য সংকেতেরা এতোদিন পর আজ কেন ধেয়ে আসছে
তীব্র জ্বরকম্পন নিয়ে রেডিও তরঙ্গে তরঙ্গে।”(উর্ধ্বগমনের দিন)

কিন্তু দারিদ্র্যক্লিষ্ট সমাজে বাহিত নিজের ‘উপবাসে উপবাসে অনঙ্গ হয়ে যাওয়া, স্বচ্ছ হয়ে যাওয়া শরীর’ নিয়ে তিনি বিব্রত বোধ করেন। উর্ধ্বগমনের দিনে তো আর বসে থাকা যায় না।
“আজ উর্ধ্বগমনের ।
এই কায়া, এই নিঃসীম বিভ্রান্তি,
ছায়াসহ, কোথায় লুকিয়ে রেখে
তবে যাই উর্ধ্বগমনে ?” (উর্ধ্বগমনের দিন)

প্রত্নপ্রেমিক কবি জানেন-
“হরপ্পার কোষে খুব হাতুড়ি-গর্জন, হ্রেষা, সিংহের বৃংহণ
শাবল মোহর শিশু সিন্ধু সুরকি পাখি লেদ লায়ারের মিশ্রিত কূজন
আরো বহু শব্দ ছিলো।” (লাল)

কিন্তু ইতিহাস বলে এরপর এদেশে-
“হৈমবালা ছোটভাইকোলে মির্জাপুর চ’লে যায়
মোরগশীর্ষের লগ্নে
গোধূমের দিনশেষে…দাঙ্গা…” (লাল)
এমন বিপর্যস্ত সমাজে বাস করেও কবি মোটেও আশাহীন নন। কারণ-
“শ্রীকৃষ্ণকে মাঝে মাঝে তাই লীলাকৃত্য ফেলে
উষাকাল থেকে
বিবিধ আমিষ ও অ্যামিনো অম্লের সামনে দাঁড়াতে হয়
নিষ্পলক, নিয়তিবাধিত।
দেখে যেতে হয় 
আমিষে এসিডে ঠিক কখন উন্মেষ, প্রথম স্পন্দনের।” (স্রোত)

এই সমসময়ের বাস্তবতা হচ্ছে-
“ইতিহাস-কারাভাঁচ্যুত পশু ও মানুষ
আবার নতুন কার কাটা মুষ্ককোষ ঘিরে আবর্তিত
…………………………………………….
কালে কালে হাড়ের কাঠামো অতিক্রম ক’রে
ছলকে ছলকে ওঠে মাংশ
পচনপ্রবণ, শুধু মাংশের ছোবল।” (স্বকাল)

তিনি যে কালে বাস করছেন সেই নির্মম বর্তমানের আর্থসামাজিক চিত্র তাঁর কাছে-
“পঙ্গু ভিখারির বিষন্ন আত্মমৈথুনের মতো
কাঁটাতারে হঠাৎ আটকে যাওয়া ভুবনচিলের
লালদীর্ঘ চিৎকারের মতো।” (স্বকাল)
এই অপার্থিব অমানবিকতার ধারাবাহিকতা ক্রমান্বয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করছে। মানুষ এখন আর মানুষের নেই। শত হিংসাজর্জর আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে তবুও কবি নিরাশ নন। তিনি জানেন যুগে যুগে ভূমিজ মানুষেরা অপশক্তির হাতে নির্যাতিত হয়েছে, প্রতারিত হয়েছে। বিভিন্ন রঙের-ঢঙের সাম্রাজ্যবাদী শক্তিরা ভূমিপুত্রদের ধ্বংস করতে চেয়েছে। তাই বলে তারা কখনও পরাজিত হয়নি। কালের ইতিহাস আমাদের এই সত্যই শেখায় যে সভ্যতা ও সংস্কৃতি সবসময়ই জয়ী হয়। তাই তিনি প্রত্যাশা করেন-

“সব উদ্বৃত্ত নিদ্রা আর আচ্ছন্নতা
পরিত্যাগ ক’রে কন্যা একসময় গাত্রোত্থান করবে,
সকন্যা আমাদের উজ্জ্বল গৃহযাত্রা হবে
সেই দুর্মর অভিলাষ ঘিরে এই সাধ্যসাধনা নিরন্তর।” (কন্যাসংহিতা)
তাঁর এই আশাবাদ কোন অলৌকিক স্বপ্ন নয়। কষ্টকল্পিত চেতনার বহিঃপ্রকাশও নয়। তাঁর একান্ত প্রার্থনা-
“এইবার এই অবেলায়, হে জ্ঞাতি, হে রহস্যের উপজাতি,
অন্তহীন শিবলিঙ্গের প্রহরী,
গলমান গ্রাফাইট স্তরের ওপর গড়াগড়ি দাও
পুনর্বার পাপ ক’রে ফিরে এসো
পুনর্বার মুদ্রণযন্ত্র ভেঙে ভূমিসাৎ ক’রে দাও হে অর্জুন
স্মৃতিভ্রষ্ট ব্যাধ, স্মরণকালের হে অবিস্মরণীয় ব্যাধি।” (সার্কারামা)
মাসুদ খান মানুষের সার্বিক মুক্তির স্বপ্নটিকে অনিশ্চিত ভাবেননা। তিনি জানেন এই হিংসাকাতর যাপিত জীবন মূলত বৃত্ত মাত্র। এক মহাকালিক বৃত্তের ফাঁদে বন্দি আমরা-
বৃত্ত ঘোরে মহাবৃত্ত
বিনাশ, মহামারী নৃত্য
মনুকুলের শেষকৃত্য
প্রাণী এবং পতঙ্গের সাথে। (সার্কারামা)

বস্তুবাদী কবির উপলব্ধি বড়ই অমোঘ ও নির্মোহ। তাই প্রাত্যাহিক জীবনের শত দুঃখ-ক্ষোভ-যন্ত্রণা থেকে আড়াল পেতে আমাদেরকে প্রতিনিয়ত জপ করার জন্য প্রদান করেন একটি সত্যমন্ত্র-
“শ্রবণ বধির ক’রে দিয়ে বয় মহাবৃত্তের হাওয়া
বস্তুর থেকে বিকশিত ফের বস্তুতে ফিরে যাওয়া।” (সার্কারামা)

চিত্রিত স্বরূপের অনুভববোধ এবং অনুষঙ্গে সবিশেষ মিজান খন্দকার

কবির মানসসঞ্জাত আবেগের শিল্পিত রূপ কবিতা। একজন ব্যক্তি নিজের অনুভূতির অন্তরালে যে অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি সঞ্চিত করেন তা যদি তার রচনায় শিল্পরূপ ধারণ করে তাহলে তিনি উপভোগ করেন কবিত্বের আনন্দ। ধরলা নদীর বিস্তীর্ণ কোলে বসে কবি মিজান খন্দকার অনুভব করেন তাঁর মর্মলোককে। চরাচরে ব্যপ্ত চিত্রপট তিনি চেনেন এবং বোঝেন তাই তাঁর দর্শনবোধের বিশেষ মাত্রা রূপ পায় বাস্তবতায়। তিনি নিঃসঙ্গ পায়চারী করেন নিবিড় নৈসর্গে। তাঁর ‘যথাকবি নিরঞ্জন’ কাব্যটি আমাদের চেতনায় এই বার্তাই পৌঁছে দেয় যে ধরলাপ্রেমী কবি সমকাল ও আধুনিকতাকে ধারণ করতে পেরেছেন। পাদপ্রদীপের কাঙাল নন তিনি। তাই অনুষঙ্গের মৌলিকত্ব তাঁর প্রধান সহায়। আপাতদৃষ্টিতে মানুষের জীবনযাত্রা এলোমেলো পথপ্রবণ হলেও তা একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যাভিমুখী। কালে কালে সকলকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু মানুষ সহজে হার মানতে নারাজ। বিপ্লব, বিদ্রোহ, সংগ্রামে মানুষ জয় করতে চেয়েছে জীবনসীমানাকে।

মিজান খন্দকার তাঁর আনন্দানুভব, বেদনাগাঁথা, ইতিহাসবোধ, বিজ্ঞানচেতনা, রাষ্ট্রিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা সমুন্নত রাখতে পেরেছেন। তিনি পুরাণকে অস্বীকার করেননি। সত্য চিনতে তিনি ইতিহাসকে বিশ্লেষণ করেছেন বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে। তাই রূপক উপমার অনবদ্য ব্যবহার মিজান খন্দকারের প্রধান সহায়। উপমার আধুনিক ও শিল্পীত প্রয়োগ তার কবিতাগুলোকে ভিন্ন রূপ দান করেছে। অনুষঙ্গের বৈচিত্র্য তাকে স্বকীয় করেছে। পৌরাণিক ও বিশেষায়িত চিত্রকল্পের বিপুল বৈভবে মিজান খন্দকারের প্রতিভা অনস্বীকার্য। তাঁর উপমা চিত্রকল্পগুলো আমাদের সামনে কবিতার এক নতুন শরীরকে পরিচিত করে। নতুন স্বাদ ও সৌগন্ধে তাঁর কবিতাগুলোর অবস্থান বাংলাসাহিত্যে সুনির্দিষ্ট।

তিনি স্বদেশের অন্তর্জ্বালা বুঝতে পারেন। চারপাশের অসঙ্গতি তাকে ব্যথিত করে। তিনি ইতিহাসের ভুলগুলোকে শোধরাতে চান। প্রত্নতাত্ত্বিক বাস্তবতার আলোকে নির্মাণ করেন একবিংশ শতাব্দীর আনন্দালোক। ধনী-গরীব, নারী-পুরুষ প্রভৃতি সামাজিক ও জৈবিক শ্রেণীবিভাগের বারান্দা পেরিয়ে তিনি অবগাহন করেন সাম্য ও মৈত্রীর সুশীতল সরোবরে। তিনি জানেন জীবনের বিকাশের জন্য প্রয়োজন জীবনের স্পর্শ। কোন মতবাদ বা আদর্শের মায়াজাল, সোনালী হাতছানি তাঁকে আর মোহমুগ্ধ করেনা। হেলাল হাফিজের ‘ভুল নেতাদের জনসভা’ মিজান খন্দকার চেনেন। নেতৃত্বের ব্যর্থতা তাকে কোন সান্তনা দেয়না। তাই কোন আদর্শেই আর তার আস্থা নেই। তিনি বরং মানুষের অন্তর্লোক উন্মোচিত করার কথা বলেন। নিজের মন ও সংস্কৃতির গভীরে অন্বেষণ করতে বলেন। কোন অজুহাতেই তিনি নিজের মর্মবোধকে বিক্রি করতে চাননা। কারণ তিনি জানেন আজ হোক কাল হোক একদিন সত্য উদঘাটিত হবেই। শত মিথ্যার প্রলোভন ও হিংস্র বাঁধা পেরিয়ে মানুষের জয় হবেই। নতুন দিনের নতুন সূর্য সেই উদয়ের প্রতীক্ষায় আছে এ প্রত্যয় তাঁর দৃঢ়বদ্ধ। আর সেই সাহসেই তিনি অকপটে উচ্চারণ করেন-
“বহুদূরে নিরপেক্ষ আলো, উজানের দিকে ছুটতে ছুটতে
প্রতিফলিত হচ্ছে বধ্যভূমির আছে পাশে।
মূলত উত্তরে যে ধরলা নদী-
তার সমসাময়িক জল
অবিরত ছুটে যাচ্ছে আজ এক জন্মদৃশ্যের অনুসন্ধানে।” (ফেরৎ পাঠাচ্ছে নদী মানুষের পরিজন, শোকপরিবাহী জল)

তিনি সচেতনভাবেই বধ্যভূমির কথা উচ্চারণ করেন। কারণ ১৯৭১ সালেই আমরা পেয়েছি আমাদের স্বতন্ত্র্য পরিচয়। আমরা মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমেই আবিষ্কার করতে পেরেছি নিজেদের অন্তর্গত শক্তিকে। দেশীয় রাজাকারদের সাথে নিয়ে পাকিস্তানিরা এ দেশের নিরস্ত্র সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে গুলি করে মেরেছিল। পাশবিক জান্তব উল্লাসে মেতে উঠে খুন করেছিল শিক্ষক, সাহিত্যিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার সহ মেধাবী বাঙালিকে। তাদের লাশগুলো কোনরকম ধর্মীয় সম্মান ছাড়াই এক জায়গায় গাদা করে পুতে ফেলা হয়েছিল। এভাবেই সমগ্র বাংলাদেশে সৃষ্টি হয়েছিল হাজার হাজার বধ্যভূমি। আজ আমরা যখন ’৭১ এর কাহিনী ভুলতে বসেছি তখন মিজান খন্দকার আমাদেরকে সচেতন করতে চেয়েছেন। সতর্ক করেছেন আমাদের অজ্ঞানতা ও বিস্মৃতি প্রবণতাকে।

মিজান খন্দকার জানেন ১৯৭১ আমাদের জীবনে অনেককিছু হলেও সব নয়। সম্পূর্ণ বাঙালিকে চিনতে হলে পুরাণের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া উপায় নেই। পুরাণের ছায়াতেই খুঁজে পাওয়া যাবে আত্মজ স্বকীয়তাকে। নৃতত্ত্বের নিগুঢ় বিশ্লেষণে ফিরে পাওয়া যাবে হারিয়ে ফেলা আমার আমিকে।
“তারপর তাম্রভস্ম ওড়ালেই হবে দৃশ্য
লুপ্ত হাড় আদি ও জটিল
সে প্রাণের শিলাধর্ম খুঁড়ে যদি পাও মর্ম
নিজ দেহে পাবে অন্ত্যমিল।” (সূত্র)

স্বাধীনতার ফল যা হবার কথা ছিল তা হয়নি। সাতচল্লিশ এর গহ্বরে যে অপশক্তি লুকিয়ে ছিল। এখন তারা প্রকাশ্যে বের হয়ে এসেছে। হিংস্র মুখ ব্যাদান করে স্বাধীনতাকে গ্রাস করতে চাইছে। কবি সময়ের দিকে সচেতন দৃষ্টি রাখেন। এখন প্রয়োজন বোধ করছেন পরিবর্তনের। তাই লোককথার বীরপুরুষকে আহ্বান জানাচ্ছেন। তাকে সাদরে গ্রহণ করার বার্তা দিচ্ছেন। সেই বীরপুরুষের হাতে বিধ্বস্ত দেশের পুনরুদ্ধার প্রত্যাশা করছেন। কবি লোকজ ভাসান গানের আঙ্গিকে লোকজ কাহিনীর আলোতে ইতিহাস বিধৃত করছেন। রূপকথার শেষ দৃশ্যের মতো স্বৈরশাসকের পরাজয় ও গণমানুষের পুনরুত্থান প্রত্যাশা করছেন।। (ভাসান)

শ্রেণী সচেতনতা মিজান খন্দকারের বিশ্বাসে আমূল গ্রথিত। মানুষের মধ্যে অন্য সব কিছুর চেয়ে শাসক ও শাসিতের সম্পর্কটি যে অন্যতম সে বোধ তাঁর প্রকট। তিনি এর বিলোপ চেয়েছেন। তিনি চান শাসকের সৌধ ধ্বংস হোক। আর এ কাজটিতে পাশে ডাকেন শোষিত শ্রেণীটিকেই। মাকর্সীয় দর্শনে আস্থা রেখে তিনি আদর্শ সমাজের সৌন্দর্য চিনে ফেলেছেন। তাই কবিতার শরীর তুলে আনেন স্বদেশের তৃণমূল মানুষঘেষাঁ লোকজ মিথ থেকে। ঐ তৃণমূল মানুষদের মনে আশার সঞ্চার করতে চেয়েছেন। কিন্তু বাস্তব বড়ই কঠিন। রূপকথার সমাপ্তি সুখকর হলেও বাস্তবের সমকালীন লোককথা খুব নির্মম। এখানে বৈষম্য ও ব্যর্থতাই সত্য। শাসকের আস্ফালনের সামনে আমরা অসহায়, পরাজিত। তাই আধুনিক লোকগল্পটির সূচনা চিরায়ত হলেও শেষাংশ বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
“সোনার পালঙ্কে কন্যা জাগিয়া উঠিল
শিয়রে অচিন এক যুবক দেখিল।
……………………….
মন্ত্রগুণে রাক্ষসেও শুনিল সে কথা
উড়িয়া পৌঁছাইল সে মায়া নদী যেথা।
নীলবর্ণ মৎস্যখানি কাটিল তক্ষণে
জন্মিল রাক্ষস আরো মহাবিস্ফোরণে।

সেই পুঁথিগত গল্পের মায়া নদীর কূল থেকে
বিস্ফোরণজনিত তীব্র তরঙ্গ
ধেয়ে এসে আঘাত হানছে
আজ এই বঙ্গরাষ্ট্রে, আকাশের সুবোধ বাতাসে।” (ফেরৎ পাঠাচ্ছে নদী মানুষের পরিজন, শোকপরিবাহী জল)

আধুনিক যুগে এখন আর কেউ কবি হয়ে জন্মায়না। প্রতিদিনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, প্রেম-বিরহ, প্রেরণা, বেদনা, উৎসাহ, প্রতিবাদ, পর্যবেক্ষণ, শ্রম, অভিজ্ঞান মিলেমিশে একজন মানুষ ধীরে ধীরে কবি হয়ে ওঠেন। তাকে নিত্যদিন নিরন্তর আত্মবিশ্লেষণ করতে হয়। আবিষ্কার করতে হয় আত্মজ অনাবিস্কৃত দিগন্ত, যন্ত্রণার দায় ও মানবিক সৌকর্যকে। মিজান খন্দকার নিজের মর্মকে বিশ্লেষণ করতে দ্বিধান্বিত নন। তিনি নিজেকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অবলীলায় বলেন-
“অসম প্রণয়ে হয়েছি অসঙ্গত
ক্রমশঃ চৈত্রকে করেছি মর্মগত।
…………………………….
যে দেহ প্রতিভা দেখালে অগোচরে
সে দৃশ্য প্রেরণা ছড়াল এ অন্তরে।”( কবি)

তবে তিনি কবিত্বের স্বরূপ বোঝেন। কবির দায়িত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে তিনি সচেতন। পার্থিব জীবনের শত ব্যর্থতা ও আশাভঙ্গের বেদনা তাঁকেও আর্ত করে তোলে। তিনি দেখেন-
“পশ্চিমপ্রবণ বায়ু হতে কতো ধর্মযুদ্ধ,
বাণিজ্য সন্ত্রাস এবং নিবিড় মেদের গদ্য
ছড়িয়ে পড়ছে
ফসলের নব-উদ্ভাবিত প্রকরণে।”(যথা কবি নিরঞ্জন)
ফলে দেশের সমাজের আর্থ সামাজিক সাংস্কৃতিক কাঠামো বিপর্যস্ত হয়ে যায়। মানুষের পতন ঘটে অন্তসারশূন্য মহাকালীক গহ্বরে। ক্ষয়ে যায় প্রাত্যাহিক প্রতিবেশ ও সার্বিক মূল্যবোধ। মানুষের অস্তিত্ব ধরে নাড়া দেয়। সর্বব্যাপী আক্রমণাত্মক ‘পশ্চিমপ্রবণ বায়ু’ তারপরও সফল হতে পারেনা।
“কেননা বিধানবর্জিত এমন দিনে
ভূ-গভীর থেকে উঠে আসছে আজও কাব্যপ্রণোদনা।” (যথা কবি নিরঞ্জন)
বাঙালির মনে জাগরুক থাকে তার অতীত দিনের ধ্রুপদী রাষ্ট্রের চিত্র। শত বৎসরব্যাপী নির্মম অত্যাচার ও অপপ্রচারে বাঙালি বিভ্রান্ত হয়না। সানন্দ দিনের স্মৃতি তাকে সবাক করে, তারা ফিরে পেতে চায় প্রাচীন মূল্যবোধ, সমাজ কাঠামো, রাষ্ট্রব্যবস্থা। প্রাত্যাহিক প্রহসন থেকে তারা মুক্তি চায়। তারা জানে রাজনীতিকেরা আজ ব্যর্থ। লোভ ও রিরংসায় তারা আপদমস্তক আবৃত। তারা শুধু চেনে নিজেকে। দেশ ও সমাজের অবমূল্যায়ন করেই তারা সমৃদ্ধ করে তোলে নিজেদের ভবিষ্যতকে। তাই সাধারণ মানুষ আশ্রয় চায় কবির কাছেই। কবিকে গ্রহণ করতে হয় ত্রাতার ভূমিকা। মানুষ প্রার্থনা করে-
“কবি হে, পুনশ্চ প্রাণ দাও এই দেহে, দাও ত্রাণ, তুমি নিরঞ্জন।”(যথা কবি নিরঞ্জন)

সমাজ কাঠামো ও বিনির্মানের ইতিহাসে নারীর ভূমিকা অপরিসীম। শ্রম ও মেধার বিনিয়োগে সমাজ সংসার রাষ্ট্রে সেও সমান অংশীদার। নৃতত্ত্বে মানুষের অগ্রগতির ইতিহাসে নারী অনেকক্ষেত্রেই চালিকাশক্তির আসনে আসীন। শিকারজীবির যুগে নিজ ভূমিকা অক্ষুন্ন রেখে নারী কৃষিজীবি যুগের জন্ম দেয়। মানুষ মহাকালীক সোপানে একটি ধাপ অতিক্রম করে উপস্থিত হয় অগ্রগতির যুগে। নিজ কর্মগুণেই নারী ফসল উৎপাদন ও সন্তান লালনে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছে। ভবিষ্যতের সমৃদ্ধি ও সুখের স্বপ্ন নারীর প্রধান সহায়। ফসল ও সন্তানকে আশ্রয় করে নারীর মনোবাঞ্ছা পূর্ণতা পায়, তাই-
“ একদিন শস্যরাজ্যে খুব অন্ধকার দেখে
বিয়োগ ব্যথায় ভরা আদিগন্ত ক্ষেতে
পৃথিবীর চিত্র এঁকে কতো না অশ্র“ ঝরিয়েছিলে!” (নারী)

বাঙালির জীবনে বর্ষাকাল এক অপরূপ অনুধ্যান। বর্ষাকাল এদেশে আসে ভিন্নপ্রাণের বার্তা নিয়ে। গ্রীষ্মের খরতাপে সবকিছু যখন শুকিয়ে চৌচির তখন বর্ষার আগমন হয় স্নিগ্ধ শীতলতা নিয়ে। প্রকৃতি উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করে বর্ষাকালে। বৃষ্টির প্রথম স্পর্শ পাবার সাথে সাথেই মাটি শিউরে ওঠে। সোঁদা গন্ধ ছড়িয়ে বৃষ্টিকে স্বাগত জানায়। তপ্ত ত্রাহি অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়ে নবজীবন সঙ্গীত গেয়ে ওঠে। প্রকৃতির ওষ্ঠাগত প্রাণ হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। বর্ষা বিষয়টি বিভিন্ন মাত্রায় ও আঙ্গিকে মিজান খন্দকারের কাছে উপস্থিত হয়েছে। একাধিক কবিতায় মেঘ, বৃষ্টি, শ্রাবণ, বন্যা, বর্ষাকাল তাঁকে ব্যাকুল করেছে। তিনি প্রকৃতির বিরুদ্ধবাদী নন। বর্ষাকাল তার কাছেও স্বস্তির মূর্ত প্রতিক। কখনো কখনো অবশ্য বর্ষার নিজস্ব রূপ কবির সামনে উপস্থিত হয় ভিন্ন আঙ্গিকে। তবে বর্ষার রূপ সবসময়ই যে স্বস্তিবাচক তা নয়। অঝোর বর্ষা শ্রমজীবী ও কৃষকের কাছে ক্ষুধার প্রতিচ্ছবি। কাজের অভাব তাকে ঘরের ভেতর বন্দী করে রাখে। স্বচ্ছল সুখী নিরাপদ গৃহকোণে যাদের বাস তারা বর্ষার অঝোর রিমঝিম শব্দে কাব্যতাড়িত হতে পারে কিন্তু গ্রামের মানুষের মনে বন্যার দু:স্বপ্ন জেগে ওঠে।

এনজিওদের আলোকিত প্রকল্পসমূহ আজ আর মিথ্যা নয়। মানুষের ক্ষমতা, সামর্থ এত সীমিত ও ক্ষীণ হয়ে পড়েছে যে এনজিওদের মুখাপেক্ষী না থেকে পারা যায়না। তাদের সর্বব্যাপী হস্তক্ষেপ থেকে আমরা কেউই আজ আর মুক্ত নই। ( পর্যটন)

আসলে মিজান খন্দকার অন্বেষণ করেন আনন্দের। জীবনের শত ব্যর্থতা, হাহাকার, লাঞ্চনার আড়ালে লুকিয়ে থাকা আনন্দকে উন্মোচিত করতে চান তিনি। নিগুঢ় প্রজ্ঞার আলোকে আবিষ্কার করতে চান মানুষের বেঁচে থাকার সহায়টুকুকে। অজ্ঞানতার কাছে আত্মসমর্পণ নয় বরং ভালোবাসা দিয়ে অন্ধকারকে জয় করবার শক্তি রাখেন তিনি। আধুনিক মননশীল দৃষ্টিভঙ্গী ও মানবতাবাদী দায়বোধ তাকে এই প্রেরণাই দিয়েছে। তিনি নিরন্তর খুঁজে ফেরেন জীবনের সাথে জীবনের যোগসূত্রকে। যে মর্মবোধ আমাদেরকে আমৃত্যু মানবিক করে রাখে তা মিজান খন্দকারের চেতনায় চির উজ্জ্বল। তিনি তাঁর দেশ-কালের লাঞ্ছনার অবসান চান। পুরান পুঁথিতেই খোঁজেন এর সমাধান। ইতিহাস ঘনিষ্ঠ পুঁথি থেকে জানতে পারেন কর্তব্যবোধ। বিদেশী মোহমুগ্ধতা নয় স্বদেশী সংস্কৃতি, নৃতত্ত্ব, ইতিহাস, পুরাণ, পুঁথি, লোককথা ঘেঁটে করণীয় বুঝে নিতে হবে। মিজান খন্দকারের মানসে দেশপ্রেম ও নতুন সমাজ গড়ার প্রত্যয় অধিকতর প্রাধান্য পেয়েছে। তিনি ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধ। স্বদেশের শ্রেষ্ঠত্ব তাঁর কাছে অনস্বীকার্য। বিদেশী ইতিহাস বা সংস্কৃতির প্রতি তার কোন বিদ্বেষ নেই। তিনি শুধু নিজেকে খুঁজে পেতে চান নিজের ঐতিহ্যে। তাই তাঁর কবিতায় স্বদেশী মিথকথা উপমা-রূপকের আড়ালে বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়েছে। স্বকালের সমস্তকে তিনি জানেন। স্বদেশের এ দৈন্য তাকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। তিনি প্রতিবাদ করেন, বিদ্রোহ করেন। বিপ্লবের আহ্বান জানান। ঝড়ের শক্তি বুকে নিয়ে এক পৌরাণিক বীরের আবির্ভাব বা গণমানুষের সংহতি তিনি কামনা করেন। সার্বিক বিপর্যস্থ গহ্বর থেকে উত্তরণের এছাড়া আর কোন উপায় নেই। তিনি বিশ্বাস করেন একদিন এক বীর রাজকুমার এসে বন্দিনী দেশকে ঘুম থেকে জাগাবে। রাক্ষসগুলোকে মেরে ফেলে উদ্ধার করবে রাজকন্যা, দেশ এবং দেশের নির্যাতিত, নিপীড়িত, নিরন্ন জনগণকে। স্বপ্নীল উচ্চাশা ছাড়া আর যেন কোন গত্যন্তর নেই। কবির এ বোধ আমাদের সভ্যতাবোধের দৈন্যকেই স্পষ্ট করে।

অতীশ দীপঙ্কর

প্রচলিত ইতিহাসে রাজা, জমিদার, সামন্তপ্রভু প্রমুখের তলোয়ারবাজির বিস্তারিত বর্ণনা লেখা হয়। কোন যোদ্ধার তলোয়ার কত বড়, কোন বাদশা রাজ্য দখলের অজুহাতে মানুষ খুনে পারদর্শী ছিলেন, কোন বীরযোদ্ধা প্রেমহীন নারীভোগে বিখ্যাত ছিলেন ইত্যাদির বিশদ বর্ণনায় ইতিহাসবিদরা মোটেও কার্পণ্য করেননি। কিন্তু সাধারণ মানুষদের জীবনবর্ণনায় তাঁরা উপেক্ষার পক্ষপাত প্রদর্শনে ছিলেন দ্ব্যর্থহীন। ফলে কৃষক, শ্রমিক, মজুর তথা সমাজের খেটেখাওয়া মানুষদের প্রাত্যাহিক জীবন থেকে গেছে ইতিহাসের অন্ধকারে। সেকালের সাধারণ মানুষদের প্রাত্যাহিক খাদ্যাভ্যাস, পাঠআগ্রহ, জীবনবিকাশের সংগ্রাম প্রভৃতি সম্পর্কে ইতিহাস একেবারেই নির্বাক। ইতিহাসে উপেক্ষিত থাকলেও কেউ কেউ তাঁদের প্রজ্ঞা ও কর্মতৎপরতার সৌকর্যে জনমানসে স্থায়ী আসন লাভ করেছেন। মানুষ পরম শ্রদ্ধায় তাঁদেরকে চিরকালীন সম্মানের উচ্চ শিখরে তুলে রেখেছেন। এরকমই একজন ইতিহাসে স্থান না পাওয়া প্রখ্যাত মানুষ হলেন অতীশ দীপঙ্কর।

বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী বাঙালীদের মধ্যে সর্বপ্রথম এবং সবচাইতে বেশিদিন ধরে আন্তর্জাতিক মণ্ডলে সম্মানিত হয়ে আসছেন একমাত্র অতীশ দীপঙ্কর। তিনি কোন রাজা-বাদশা নন, কোন যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি নরহত্যায় দক্ষতা দেখাননি, সাধারণ জনগোষ্ঠীর সম্পদ লুণ্ঠনেও তিনি পারদর্শী নন তাই হয়তো ইতিহাসের পাঠকরা তাঁকে চেনেননা। তাই বলে তিনি জনমানসে বিস্মৃত নন। বরং যারা বিদ্যা ও জ্ঞানকে প্রয়োজনীয় ও কাক্সিক্ষত বিবেচনা করেন তাদের কাছে অতীশ দীপঙ্কর এখনও রয়ে গেছেন চিরনমস্য। মেধার কল্যাণী স্ফুরণ তাঁকে যেকালে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দিয়েছিল তা অনেকের দৃষ্টিতে অন্ধকার কাল বলে নিন্দিত। কালের বিবেচনায় সেকালে বাংলা বলে কোন স্বতন্ত্র ভাষা কিংবা বাঙালি বলে কোন স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠীর জন্মই হয়নি। বাংলা ভাষার প্রদীপ তখন প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল মাত্র। সেই ৯৮২ খ্রিস্টাব্দে পৃথিবীর অপার নীল আকাশে প্রথম দৃষ্টিপাত করেন তিনি। আধুনিক বাংলাদেশের বিক্রমপুর জেলার অন্তর্গত বজ্রযোগিনী গ্রামের নিবিড় প্রাকৃতিক পরিবেশে তিনি অতিক্রম করেন তাঁর শৈশব ও কৈশোরকাল।

সেকালের সমাজ ছিল সামন্ত প্রভাবিত। ফলে সাধারণ মানুষ নিয়মিত যুদ্ধবিগ্রহের আতংকের মধ্যেই জীবনযাপন করতো। প্রত্যক্ষ করতো রক্তলোভী শাসকের পাশবিক উল্লাস। এমন মধ্যযুগীয় সমাজব্যবস্থার মধ্যে জন্মগ্রহণ করেও অতীশ দীপঙ্কর বিদ্যা, জ্ঞান, সততা, সরলতা, পাণ্ডিত্যে সর্বভারতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিবেচিত হয়েছিলেন। আধুনিক কালের বাঙালীর শত ব্যর্থতা ও মিথ্যাচারের বিপরীতে সহস্র বৎসর অতীতের একজন বাঙালীর জ্ঞান-বিদ্যার জগতে শীর্ষস্থান লাভের বিষয়টি সত্যিই আলোচনার দাবী রাখে।

খ্রিস্টপূর্ব ৬২৩ অব্দে মহামুণি গৌতম বুদ্ধ জন্মগ্রহণ করেন। নেপালের লুম্বিনী গ্রামে বোধি বৃক্ষের ছায়ায়, মহামায়া মাতার কোলে। তিনি ৩১ বৎসর বয়সে সংসারে বৈরাগ্য বোধ করেন। তিনি একটি নতুন দর্শন, সমাজ মর্মবোধের সাথে মানব জাতির পরিচয় ঘটান।

আজ থেকে আড়াই হাজার বৎসর আগে যখন তিনি জন্মেছিলেন সমাজ ব্যবস্থার নৃতাত্ত্বিক ধারায় ভারতীয় সমাজ তখন কৃষিজীবী জীবন যাপন করছে। বিভিন্ন ধাতুর ব্যবহার শিখেছে। গৃহপালিত প্রাণীদেরকে নির্দিষ্ট করতে পেরেছে। আধুনিক যুগের তুলনায় আদিম জীবনযাত্রায় বাস করে গৌতম বুদ্ধ যে জীবন দর্শনকে উপলব্ধি করেছিলেন, তার আবেদন আজও শেষ হয়ে যায়নি। তাঁর মৃত্যুর কিছু পরে পণ্ডিত সক্রেটিসের সুযোগ্য ছাত্র গ্রীক বীর আলেকজান্ডার ভারত জয় করে। ফলে ভারতীয় জ্ঞান বিজ্ঞান আন্তর্জাতিক পরিচিতি পাওয়া শুরু করে। মেগাস্থিনিসের অনেক রচনায় বৌদ্ধদর্শনের কথা লেখা আছে। গৌতম বুদ্ধের পরে যে দার্শনিকেরা জন্ম নিয়েছেন তাদের মধ্যে জৈন ধর্মগুরু মহাবীর(৫৯৯ খ্রিস্টপূর্ব), পিথাগোরাস (৫৭০- ৫০০ খ্রি.পূ.), হেরাক্লিটাস (৫৩৫- ৪৭৫ খ্রি.পূ.), সক্রেটিস (৪৬৯- ৩৯৯ খ্রি.পূ.), এরিস্টটল (৩৮৪- ৩২২ খ্রি.পূ.) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। এদের মাধ্যমে বৌদ্ধ দর্শন ইউরোপে বাহিত হয়। আধুনিক যুগের কান্ট, হেগেল, মার্কস, জাঁ পল সার্ত, আলবেয়ার কাম্যু, কার্ল মার্ক্স প্রমুখের লেখায় বৌদ্ধদর্শনের স্পর্শ বেশ স্পষ্ট।

গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর পর তাঁর দর্শন সম্বন্ধে জানতে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা বেড়ে যায়। হিমালয়ের অপরপার্শ্বে অবস্থিত চীনের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী নিজেদের অন্তর্কলহ মেটাতে মহান লাওৎসে প্রবর্তিত তাওবাদ ও জ্ঞানী কনফুসিয়াসের কনফুসিয়াসবাদের বিপরীতে বৌদ্ধদর্শনের গুরুত্ব অনুধাবন করেন। খৃস্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকেই ভারত ও চীনের পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। চীন অঞ্চল থেকে যেসব শ্রমণরা ভারত ভ্রমণে আসেন তাঁদের মধ্যে ‘ফা-হিয়েন’ (মতান্তরে ‘ফা-হিয়ান’) আসেন ৩৯৯ খ্রিস্টাব্দে, ‘চে-মেং (মতান্তরে ‘চি-য়েন) আসেন ৪০৪ খ্রিস্টাব্দে, ‘ফা-ইয়ং আসেন ৪২০ খ্রিস্টাব্দে, ‘হিউয়েন সাঙ’ ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে, ‘ই-চিং’ (মতান্তরে ‘আই-ৎ-সিঙ্গ’ বা ‘ইৎ-সিঙ’) ৬৭২ খ্রিস্টাব্দে এবং ‘উ-খোং’ আসেন ৭৫১ খ্রিস্টাব্দে। এক বৎসরের দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে চীন থেকে এই পণ্ডিতেরা ভারতে এসে এদেশীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে যে আগ্রহ প্রকাশ করেছে তাঁর বিপরীত উদাহরণ ইতিহাসে বিরল। বিদেশ থেকে ভারতে ধর্মানুরাগী শ্রমণরাই শুধু এসেছেন এমন নয়। ভারত থেকেও বেশকিছু বৌদ্ধশাস্ত্রীয় পণ্ডিত মধ্য এশিয়ার প্রান্ত পর্যন্ত বুদ্ধের বাণী বহন করে নিয়ে গিয়েছেন। ‘শান্তরক্ষিত’, ‘পদ্মসম্ভব’, ‘কমলশীল’ প্রমুখ ভারতীয় পণ্ডিতদের নাম তিব্বতীয় গ্রন্থগুলিতে পাওয়া যায়। ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে গিয়ে যারা বৌদ্ধদর্শনের মহত্বকে বিদেশীদের চোখে কাক্সিক্ষত করে তুলেছিলেন তাঁদের মধ্যে একমাত্র অতীশ দীপংকরই প্রখ্যাত হয়েছিলেন। ৯৮২ খ্রিস্টাব্দে বর্তমানের বাংলাদেশ অঞ্চলে জন্ম নেয়া অতীশ দীপংকর প্রথম জীবনে তান্ত্রিক হতে চেয়েছিলেন। এসময়ে তিনি ধারণ করেন ‘গুহ্যজ্ঞানবজ্র’ নাম। আচার্য অবধূতিপা ছাড়াও বিখ্যাত পন্ডিত সিদ্ধাচার্য নারোপা এবং ডোম্বিপা তাঁর গুরু ছিলেন। উনতিরিশ বৎসর বয়সে তিনি বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হয়ে ‘দীপংকর শ্রীজ্ঞান’ নাম গ্রহণ করেন। তিব্বত ও মঙ্গোলিয়ায় অতীশ দীপংকর এত বেশি সুখ্যাত যে এখনও তিনি ‘জোবো জে’ (মহাগুরু  অতীশ) নামে পূজিত হন। ১০১৩ খ্রিস্টাব্দে একতিরিশ বৎসর বয়সে তিনি অদ্বিতীয় পণ্ডিত ধর্মকীর্তির কাছে জ্ঞানশিক্ষা করার ইচ্ছা নিয়ে সুবর্ণদ্বীপে (ইন্দোনেশিয়া) আসেন। বারো বৎসর ধরে সুমাত্রায় থেকে বৌদ্ধধর্মচর্চা করেন। ১০২৫ খ্রিস্টাব্দে সুমাত্রার রাজনৈতিক পরিবেশ দূষিত হয়ে যাবার কারণে তিনি ভারতে ফিরে আসেন। বাংলা অঞ্চলের বিখ্যাত ‘বিক্রমশীল বিহার’, ওদন্তপুরী বিহার’ ও ‘সোমপুর বিহার’ তাঁকে অধ্যাপক হিসেবে গ্রহণ করে। সোমপুর মহাবিহারে কয়েক বৎসর শিক্ষকতাকালে তিনি ‘মধ্যমকরত্নপ্রদীপ’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। তিব্বতে নতুন ধর্ম হিসেবে বৌদ্ধ ধর্ম এই সময়ের আগে থেকেই  যাত্রা শুরু করেছে। কিন্তু যথাযথ ব্যাখ্যাকারের অভাবে বৌদ্ধধর্মের মূল আস্বাদ ও উপলব্ধি অনেকাংশে ম্লান হয়ে যাচ্ছিল। সমাজে বেড়ে ওঠা অস্থিরতার পরিমাণও সীমিত রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। এই সময়ে তিব্বতবাসীরা অতীশ দীপংকরের মতো পণ্ডিতের প্রয়োজন বোধ করেন। তিব্বতবাসী ভিক্ষুদের জোর পীড়াপীড়িতে অতীশ দীপংকর তিন বৎসরের জন্য তিব্বতের বৌদ্ধশাস্ত্রীয় আবহাওয়াকে পূর্ববৎ নির্মল করার জন্য কাজ করবেন বলে কথা দিলেন। ১০৪০ খ্রিস্টাব্দে কয়েকজন শিষ্য, দোভাষী এবং বেশকিছু গ্রন্থ নিয়ে তিব্বতের দিকে রওনা হন। বৌদ্ধ ধর্মকে তিনি এতবেশি ভালোবাসতেন যে আটান্ন বৎসর বয়সে পনেরো-ষোল হাজার উঁচু বরফে ঢাকা পাহাড়ী পথ বেয়ে তিব্বতে যাওয়াকে তিনি কঠিন ভাবেননি। তবে শর্ত মোতাবেক তিন বৎসরের মধ্যে ভারতে ফিরে আসবেন সে দুরাশাও মনের মধ্যে বহন করতেন না। প্রায় দেড়শো বৎসর আগে তিব্বতের ‘লাংদারমা’ নামে এক রাজা বৌদ্ধধর্মের উপর প্রভূত অত্যাচার করেছিল। অসংখ্য বৌদ্ধমঠ ধ্বংস এবং অসংখ্য বৌদ্ধ ভিক্ষুকে হত্যার পর একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুর হাতে তিনি নিহত হন। এই সম্পর্কিত রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনাপ্রবাহ অতীশ দীপংকরের কাল পর্যন্তও ধারাবাহিক ছিল। ফলে অতীশকে তিব্বতে অনেক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাবলীর মুখোমুখি হয়েই সামনের পথে এগিয়ে যেতে হয়েছিল। তিব্বতে অতীশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল ‘বোধি-পথ-প্রদীপ’ গ্রন্থটি লেখা। এর টীকা গ্রন্থটির নাম ‘বোধিমার্গ-প্রদীপ-পঞ্জিকা’। এছাড়াও তিনি ‘রত্নকরণ্ডোদঘাট’, ‘অভিসময়-বিভঙ্গ’, ‘চিতা-বিধি’, নাগ-বলি-বিধি, ‘চিকিৎসা-জীব-সার, ‘দশ-অকুশল-কর্ম-পথ-দেশনা’ প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেন। তেরো বৎসরের তিব্বত বাসকালে তিনি প্রায় সমস্ত তিব্বতী বৌদ্ধমঠে ভ্রমণের সঙ্গে সঙ্গে অন্তত ৭৯টি গ্রন্থ সংস্কৃত ভাষায় রচনা করেন। এজন্য তিনি তিব্বতীদের দ্বারা সম্মানজনক ‘অতীশ’ উপাধিতে ভূষিত হন। তিব্বতী ভাষায় তেমন অধিকার না থাকার কারণে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান সবসময় সংস্কৃত ভাষায় লিখতেন এবং সাথে থাকা অনুসারীরা তা তিব্বতী ভাষায় অনুবাদ করে ফেলত। ১০৫৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি তিব্বতেই মৃত্যু বরণ করেন। প্রাচীন যুগের এই মহান বাঙালি পণ্ডিত তিব্বতের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে এভাবেই চিরস্থায়ী আসন তৈরি করে নেন।

১২০০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে ভারতে প্রাপ্ত গৌতম বুদ্ধ সম্পর্কিত বেশিরভাগ গ্রন্থ যার আনুমানিক সর্বমোট সংখ্যা ১৪ হাজার, এর সবগুলো তিব্বতী ও বিভিন্ন বিদেশী ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিল। তিব্বতে এই বিশাল গ্রন্থরাশি দুইভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রথমটির নাম ‘তাঞ্জুর’ এবং দ্বিতীয়টির নাম ‘কাঞ্জুর’। তাঞ্জুরে আছে সাড়ে তিন হাজার বৌদ্ধ ধর্মীয় গ্রন্থের অনুবাদ আর কাঞ্জুরে রয়েছে বুদ্ধের বাণী সম্বলিত এগারোশো আটটি গ্রন্থ। অতীশ দীপঙ্করের লেখা গ্রন্থগুলির সবগুলো এখনও তিব্বতী ভাষায় অনূদিত হয়ে ‘তাঞ্জুর’ সংকলনে রয়েছে। ভারতবর্ষে পরবর্তী বিদেশী শাসনের কালে সংস্কৃতে লেখা এই অমূল্য গ্রন্থরাজি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। আধুনিক যুগে তিব্বতী অনুবাদ থেকে ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমেই ইতিহাসকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হয়েছে।

বিস্মৃত কবি ও নাট্যকার ভাস

সপ্তম খৃস্টাব্দের বামন, দশম খৃস্টাব্দের অভিনবগুপ্ত, একাদশ খৃস্টাব্দের ভোজদেব, দ্বাদশ খৃস্টাব্দের সারদাতনয়, সর্বানন্দ, রামচন্দ্র, গুণচন্দ্র এবং ত্রয়োদশ খৃস্টাব্দের সাগরনন্দীসহ আরও অনেক স্বনামখ্যত সাহিত্যিকদের রচনায় ভাস এর নাম পাওয়া যায়। এছাড়াও অসংখ্য প্রাচীন শ্লোকে বিভিন্ন যুগের প্রাজ্ঞ লেখকগণ সশ্রদ্ধায় ভাসের নাম স্মরণ করেছেন। দণ্ডী, বামন, ভামহ, কালিদাস প্রমুখ কবিগণ নিজেদের রচনায় ভাসের রচনাবলী থেকে অনেক উদাহরণ উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আধুনিক যুগের কিছুকাল পর্যন্ত প্রাচীন কবি ও নাট্যকার ভাসের মূল রচনা খুঁজে পাওয়া যায়নি। ১৯০৯ সালে মহামহোপাধ্যায় ডাঃ টি গণপতি শাস্ত্রী কয়েকটি পুরাতন পুঁথি ধূলিধূসরিত-অবহেলিত অবস্থায় এক কৃষকের ভাঁড়ার ঘর থেকে খুঁজে পান। দেখা যায় এখানে মোট পুঁথির সংখ্যা তের। এখানে এমন সব উপমা, রূপক, অলংকার খুঁজে পাওয়া যায় যা পূর্বে প্রাপ্ত বিভিন্ন লেখকের রচনায় ভাসের রচনা বলে উদ্ধৃত হয়েছে। তবে কোন রচনার সুচনাতেই রচয়িতার নাম না থাকায় কিছুটা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। সে সময় অনেকে মনে করেছিলেন যে প্রাপ্ত পাণ্ডুলিপিগুলো বোধহয় ভাসের রচনা নয়। কিন্তু এখন আর কেউ একথা বলেন না। সকলেই মহামহোপাধ্যায় গণপতি শাস্ত্রী মহাশয়ের দেয়া যুক্তি মেনে নিয়েছেন।

অনেকে সময়কালের বিচারে কালিদাসের সাথে ভাসকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কার্পণ্য করেন। কিন্তু কালিদাস এবং ভাসের একাধিক রচনা সামনে রেখে আমরা যদি গভীর ভাবে অধ্যয়ন করি তাহলে দেখতে পাবো তাঁদের দুজনের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে সময়কালের যথেষ্ট পার্থক্য আছে। বরং তৃতীয় শতকের শেষের দিকে রচিত কালিদাসের ‘মালবিকাগ্নিমিত্র’ নাটকের প্রস্তাবনাতেই ভাসের নাম প্রথম পাওয়া যায়। সংস্কৃত, পালি ও প্রাকৃত ভাষার বিশিষ্ট পণ্ডিত রবীন্দ্রনাথ ঘোষ ঠাকুর বলেছেনÑ “মালবিকাগ্নিমিত্র নাটকের প্রস্তাবনায় ‘প্রথিতযশসাং ভাস(ধাবক)-সৌমিল্ল-কবিপুত্রাদীনাং প্রবন্ধানতিক্রম্য বর্তমানকবেঃ কালিদাসস্য কৃতৌ কথং বহুমানঃ’  এই বাক্যে কালিদাস ভাসের নাম উল্লেখ করিয়াছেন এবং পরবর্তী শ্লোকের ‘পুরাণমিত্যেব ন সাধু সর্বং ন চাপি কাব্যং নবমিত্যদ্যম্’  এই বাক্যে ভাস প্রভৃতির কাব্যকে পুরাণ এবং নিজের কাব্যকে ‘নব’ বলিয়াছেন।” এছাড়াও কালিদাসের নাটকে সংস্কৃত ও প্রাকৃত ভাষার যেসব বিভিন্ন ব্যবহার রয়েছে সেগুলির চাইতে ভাসের রচনার সংস্কৃত ও প্রাকৃত ভাষার ব্যবহারের রূপে যথেষ্ট পার্থক্য আছে। ভাসের নাটকগুলির সংস্কৃত ও প্রাকৃত ভাষা কালিদাসের রচনার চাইতে বেশি প্রাচীন। কালিদাসের রচনার সাথেও ভাসের রচনাভঙ্গীর যথেষ্ট পার্থক্য আছে। ভাসের রচনা সরল অনাড়ম্বর, অপেক্ষাকৃত স্বাভাবিক ও সহজবোধ্য। তুলনায় কালিদাসের রচনাভঙ্গী জটিল ও গাম্ভীর্যময়। ভাসের নাটকের রাজসভার চিত্রের চাইতে কালিদাসের নাটকের রাজসভার চিত্র বেশি ঐশ্বর্য ও চাকচিক্যময়। খৃস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে পতঞ্জলীর আবির্ভাব হয়েছিল। বিশ শতকের প্রথমাংশ পর্যন্ত ভাস আমাদের নিকট অপরিচিত থাকলেও পতঞ্জলীর পূর্বকাল, সমকাল ও পরবর্তীকালে তিনি যশভারে বিখ্যাত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঘোষ ঠাকুর বলেছেনÑ “সংস্কৃত সাহিত্যের বহু খ্যাতনামা লেখক বহু প্রাচীনকাল হইতেই তাঁহার উচ্ছসিত প্রশংসা করিয়া আসিতেছেন। নবম খ্রিস্টাব্দের রাজশেখর তাঁহার সুক্তিমুক্তাবলী নামক পুস্তকে ভাস-নাটকচক্রের মধ্যে স্বপ্নবাসবদত্ত নাটককে সর্বশ্রেষ্ঠ বলিয়াছেন এবং প্রখ্যাত কবিগণের একটি তালিকার মধ্যে ভাসকেই প্রথম স্থান দিয়াছেন।” সেই সময় সংস্কৃত ভাষার একটি মানরূপ দাঁড়িয়ে যাওয়ায় পাণিনির ব্যাকরণের সূত্রগুলি সুসংহত ও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু ভাসের রচনায় সংস্কৃত কথ্যভাষার ব্যাপক ব্যবহার আছে। কালিদাসের মতো ভাসি নিজ যুগে খুবই প্রশংশিত ও বিখ্যাত ছিলেন। তাঁর অনুগামীর সংখ্যা এত বেশি ছিল যে মনে হয় প্রাচীন যুগে তিনি ঋষির মর্যাদা পেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঘোষ ঠাকুর বলেন- “নাটক রচনায় ভাস প্রচলিত ভরতের নাট্যশাস্ত্র অনুসরণ করেন নাই। ইহাতে মনে হয় ভরতের নাট্যশাস্ত্র প্রবর্তিত হওয়ার পূর্বে পাণিনি কর্তৃক উল্লিখিত ‘নটসূত্র’ কিংবা অন্য কোন প্রাচীনতর নাট্যশাস্ত্রের অনুসরণ করিয়া ভাস তাঁহার নাটকগুলি রচনা করিয়াছেন।” প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও অর্থশাস্ত্র রচয়িতা চাণক্য তাঁর গ্রন্থের ‘নবং শরাবম্…’ শ্লোকটি ভাসের ‘প্রতিজ্ঞাযৌগন্ধরায়ণ’ নামক নাটক থেকে উদ্ধৃত করেছিলেন। তাই একথা এখন সকলে মেনে নিয়েছেন যে ভাস চাণক্য, কালিদাস, ভরত, পতঞ্জলি, কিংবা পাণিনির চাইতেও প্রাচীন।

ভাস যে কালে জন্মেছিলেন সেযুগে মানুষ মনের ভাব ছন্দ করে প্রকাশ করে আনন্দিত হত। তাই সাহিত্য-বিজ্ঞান-দর্শনসহ চিন্তাজগতের সবকিছুই ছন্দসহ পদ্যাকারে লিখিত হত। ভাসের নাটক তেরটিও পদ্যে লিখিত। সৌন্দর্যময় কাব্যকৃতির অনন্য নিদর্শণ এই নাটকগুলিকে বিষয়বস্তু অনুসারে চারভাগে ভাগ করা যেতে পারে। যেমনঃ-

ক) রামায়ণের কাহিনী অনুসরণে রচিত নাটক- প্রতিমা ও অভিষেক।
খ) মহাভারতের কাহিনী অনুসরণে রচিত নাটক- পঞ্চরাত্র, দূতঘটোৎকচ, মধ্যমব্যায়োগ, কর্ণভার, উরুভঙ্গ, দূতবাক্য ও বালচরিত(হরিবংশ)।
গ) ঐতিহাসিক নাটক- স্বপ্নবাসবদত্ত, প্রতিজ্ঞাযৌগন্ধরায়ণ।
ঘ) কল্পিত কাহিনী অবলম্বনে রচিত নাটক- চারুদত্ত ও অবিমারক।
অন্তমিলের আদর্শে লিখিত এই রচনাগুলোর কোন শিরোনাম বা বর্ণনা ছিলনা। তবে সবগুলো ছিল আকর্ষণীয় ভাষাবহুল পদ্যে লেখা এবং এক একটি কাহিনী বা নাটক। একাধিক চরিত্রের সংলাপের মধ্য দিয়ে কাহিনী এগিয়ে গেছে। কবিতা রচনায় অসাধারণত্বের জন্য ভাসকে সেকালে মহাকবিও বলা হত। রচনাগুলির নাট্যমান অধিকতর শক্তিশালী বলেই তাঁকে আধুনিককালে নাট্যকার বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত সুকুমারী ভট্টাচার্য বলেছেন- “ভাস ছিলেন প্রথম ভারতীয় নাট্যকার। সংস্কৃত ভাষায় অপর কোনো নাট্যকারের ভাণ্ডারেই এতসংখ্যক নাট্যসম্পদ নেই।” বিমানচন্দ্র ভট্টাচার্য বলেছেন- “রচনাশৈলী, ঘটনাবিন্যাসের পারিপাট্য, ভাষার গাম্ভীর্য ও প্রকাশনপটুতা, শব্দচয়ন, ভাবসমৃদ্ধি প্রভৃতি গুণে নবাবিষ্কৃত নাটকগুলি সংস্কৃত সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। যিনিই ইহাদের রচয়িতা হন না কেন তিনি যে শক্তির পরিচয় দিয়াছেন তাহা যে কোনও প্রথমশ্রেণীর নাট্যকারের কাম্য।” ভাসের নাটকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার বিষয়বস্তুর ক্রমবিকাশ ও গতিবেগ। চরিত্রাঙ্কন সফলতায় ভাস অদ্বিতীয় প্রতিভার অধিকারী। দ্রুতগতির কাহিনীকাব্য সৃষ্টি করে তিনি খুব অল্পকথায় কোন বিশেষ চরিত্রের বিশেষত্ব ফুটিয়ে তোলেন। সৌন্দর্যময় কথোপকথন  ও কৌতুহলী পরিবেশ সৃষ্টি করে ভাস অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে নাটকের গতিবেগকে প্রবহমান রাখেন। ভাসের মনোজগতে বাল্মিকীর মহাকাব্যের বিশেষ প্রভাব রয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে তাঁর রচনাবলীতে। তাই বলে তাঁর নাটক কখনো কাব্যময় হয়ে যায়নি। বরং এক্ষেত্রে তিনি তাঁর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অন্যান্য নাট্যকারদের চাইতে স্বতন্ত্র ছিলেন।

ভাস স্বভাবগত দিক থেকে পরিহাসপ্রিয় ছিলেন। তাই কখনো কখনো তিনি তাঁর রচনায় আবেগের প্রাবল্য রোধ করতে পারেননি। কোন কোন জায়গায় প্রভূত আবেগের অভিব্যক্তি হিসেবে মাঝে মাঝে তিনি অতিশয়োক্তি ব্যবহার করেছেন। ব্যঙ্গোক্তি ও ব্যাজস্তুতি রচনায় ভাস ছিলেন অসাধারণ কৌশলী। বিভিন্ন মহাকাব্যের কাহিনীতে তাঁর এই মানসিক বৈশিষ্ট্যের প্রভাব রয়েছে। তিনি মাঝে মাঝে নাটকের কাহিনীতে এমন সব ঘটনার সৃষ্টি করেছেন যা অভিনব নাট্যপরিহাসের সৃষ্টি করেছে। মানবজীবন, মানসিক আবেগ, সামাজিক ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব ইত্যাদি বিষয়ে বহু সংক্ষিপ্ত অথচ অমোঘ ও কাব্যময় পর্যবেক্ষণ তাঁর একাধিক রচনায় লক্ষ্য করা যায়। এগুলির কয়েকটি নীতিশাস্ত্রের পর্যায়ভুক্ত, কয়েকটি আবার কাব্যগুণমণ্ডিত। যেমনঃ “শত্রু দেহে আঘাত করে, প্রিয়জন হৃদয়ে।” তিনি ‘প্রতিমা’ নাটকে একাধিক অসাধারণ উপমা, রূপক, প্রবাদ-প্রবচন, অলংকারের সঠিক ও পরিমিত ব্যবহার করেছেন। রামকে বনবাসে পৌঁছে দিয়ে ফিরে এসে সারথি সুমন্ত বলে- “শূন্য রথে সারথি আমি বেঁচে আছি।” ভরতকে রাজ্যভারগ্রহণ করার জন্য বললে সে বলে- “ক্ষতস্থানে আঘাত কোরো না।” এই ধরণের সংক্ষিপ্ত অথচ অর্থবহ ও আবেদনময় পংক্তি ভাসের রচনার অন্যতম অলংকার।

খ্রিস্টিয় অব্দের প্রথমদিকের শতাব্দীগুলোতে উত্তর ভারতের সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে ভাসের নাটকগুলোতে বহু তথ্য পাওয়া যায়। সমাজের বহু বিচিত্র অংশের, বর্ণের, ব্যক্তির, গোষ্ঠীর পরিচয় এখানে মেলে; যেমন- রাজা, মন্ত্রী, পুরোহিত, বন্দী, পরিব্রাজক, শিক্ষক, হস্তিপক, ভিক্ষু, গুপ্তচর, কঞ্চুকী, ব্রাহ্মণ প্রভৃতি। নারীদের মধ্যে রাণী, রাজকণ্যা এবং তাঁরা সম্পর্কিত একাধিক নারীদের কথা ভাস লিখেছেন। ভাসের রচনা থেকে আমরা জানতে পারি সেকালের নারীরা এক মুক্ত, অবাধ, স্বাধীন ও নিশ্চিন্ত জীবন যাপন করতো। কোনও কিছুর অজুহাতে নারী হিসেবে তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা হতনা। সেকালের সামাজিক চিত্রের অন্যতম একটি বিষয় হল ভিক্ষুকের অভাব। ভিক্ষুক শব্দ দ্বারা বর্তমানে যে কর্মজীবীদের বোঝানো হয় সে ধরণের কোন চরিত্র সেকালের সমাজে অনুপস্থিত ছিল। এটা সেকালের এক স্বচ্ছন্দ ও প্রাণোচ্ছল সমাজের চিত্র বহন করে, বোঝা যায় জীবনযাত্রার প্রবাহ এখানে সানন্দ, অবাধ ও নির্ভাবনার ছিল।

ভাসের প্রায় সব নাটকের ঘটনাপ্রবাহ সাধারণত বেশ দ্রুতগতির; কাহিনী কোথাও থেমে থাকেনা। এই প্রবহমান ঘটনারাশি অবশ্য কখনও কখনও সাহিত্যিক উৎকর্ষ প্রদর্শনের আবেগে বাধা পেয়েছে। তারপরও বলা যায়, তাঁর নাটকে ঘটনার প্রাধান্যই প্রধান। বিভিন্ন দৃশ্যাবলী ও অভিনেতাদের বর্ণনা সেখানে গৌণ; অনেকক্ষেত্রে যেখানে ঘটনাকে সাহায্য করে সেখানে ছাড়া অন্য জায়গাগুলোতে সংলাপও সংক্ষিপ্ত। ধ্রুপদী ধারার সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনায় একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, তা হলো শব্দের গাম্ভীর্য। এটি পরবর্তী ধ্রুপদী সাহিত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছিল। এর সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনায় মহাকবি ভাসের রচনাশৈলীকেই অধিকতর স্বচ্ছন্দ ও পরিশীলিত মনে হয়। তাঁর রচনায় ভাষা প্রায় সহজ, সরল, অকৃত্রিম তবে গদ্যসুলভ, তবু আবেগের গভীরতায়, অনুভূতির সারল্যে, প্রকাশের আকুলতায় এই নাটকগুলি অনেক অলংকৃত কাব্যের মহিমাকেও অতিক্রম করে যায়। অর্থের স্পষ্টতা ও ভাষার স্বচ্ছতা একটি আদর্শ কাব্যের বিশেষ গুণ। ভাসের প্রতিভায় এই বৈশিষ্ট্যটি ছিল সমুজ্জ্বল। সামাজিক কর্তব্য, মানসিক পক্ষপাত, দয়া, ভালোবাসা ইত্যাদি অনুভূতিগুলো মানুষের জীবনকে বিভিন্নভাবে দুঃখে ভারাক্রান্ত করে, এই মানবিক দায়িত্ব-বেদনার কাহিনীগুলোকে ভাস অতি সুক্ষ্ম সংবেদনশীল নিপূণতার সঙ্গে বর্ণনা করেছেন। ফলে তাঁর নাটকগুলো হয়ে উঠেছে এক সম্পূর্ণ পরিণত বোধদীপ্ত সাহিত্যকৃতি, প্রত